বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

আইনের প্রয়োগে ক্ষমতা নয়, ন্যায় ও মানবিকতা চাই

লেখক.সাংবাদিক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন চৌধুরী
রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু আইন প্রয়োগের নামে যদি ক্ষমতার প্রদর্শন, অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা, অপমান কিংবা হয়রানির সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে সেখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আইনের প্রয়োগ কি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করছে, নাকি ক্ষমতার ভয় তৈরি করছে?

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে আমরা কথা বলে আসছি। বড় ধরনের অপরাধের অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পান, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান। তাহলে তুলনামূলকভাবে ছোট কোনো অনিয়মের অভিযোগে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কেন তার বক্তব্য বলার পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন না?

কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। কিন্তু অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তাকে জনসম্মুখে অপরাধীর মতো অপমান করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি হতে পারে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, বাজারে শৃঙ্খলা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। মোবাইল কোর্টও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ক্ষমতা প্রয়োগের ধরনটি কেমন হবে?
কোনো ছোট ব্যবসায়ী বা দোকানদারের বিরুদ্ধে সামান্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যেন তিনি সমাজের সবচেয়ে বড় অপরাধী। অনেক সময় দেখা যায়, অভিযানের দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে আইনগত শাস্তির পাশাপাশি সামাজিকভাবেও ওই ব্যক্তি অপমানিত হন। অথচ যে অপরাধটি সতর্কতা, সংশোধন, সতর্কীকরণ বা সীমিত জরিমানার মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব ছিল, সেটিই কখনো কখনো জনসম্মুখে এক ধরনের সামাজিক শাস্তিতে পরিণত হয়।

আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষকে অপমান করা নয়।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—একজন দোকানদারও একজন নাগরিক। তারও আত্মসম্মান আছে, পরিবার আছে, সামাজিক পরিচয় আছে। কোনো অপরাধ বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আইন প্রয়োগের সঙ্গে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন যুক্ত হয়ে গেলে সেখানে ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকেই অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ আছে, কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রোশ, ব্যবসায়িক বিরোধ কিংবা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের প্রভাবের কারণে কোনো কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—তা যথাযথভাবে যাচাই করার আগেই যদি অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো ব্যবসায়ী যদি অভিযোগের বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে চান, অনেক সময় তাকে সেই সুযোগটুকুও দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত জরিমানা, শাস্তি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর পক্ষে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার বা নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে যায়।

অভিযোগ যদি সত্য হয়, আইন অবশ্যই তার নিজস্ব গতিতে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া হলে সেটি শুধু একজন ব্যবসায়ীর ক্ষতি নয়; এটি আইনের প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই অভিযোগকারীর যেমন অভিযোগ করার অধিকার আছে, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তিরও অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের ন্যায্য সুযোগ থাকা জরুরি।

আরও উদ্বেগের জায়গা হলো, মোবাইল কোর্টের অভিযানের সময় উপস্থিত উৎসুক জনতার একটি অংশ কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে ছোটখাটো অনিয়মও বড় অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও একজন মানুষের ব্যবসা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

এখানে ভোক্তা অধিকার সংস্থার অভিযান কিংবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আইনগত ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—এই ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা সংযত, নিরপেক্ষ, আনুপাতিক ও মানবিক?

বিশেষ করে কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, অভিযোগের প্রকৃতি যাচাই করা, অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করা এবং শাস্তির সঙ্গে অপরাধের সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে বড় শাস্তি কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপমানের সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইনকে ভয় পেতে শুরু করবে, কিন্তু শ্রদ্ধা করবে না।
আর আইনকে ভয় নয়, আইনের প্রতি আস্থা তৈরি করাই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এই জায়গাতেই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও আমাদের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী দোকানের পণ্য নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংস্থায় অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগ করার পর তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে—এমন অভিযোগই ভিডিওটিকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকার পরও যদি একজন নারীকে পেছন থেকে লাথি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও বটে।
একজন নাগরিকের অভিযোগ করার অধিকার আছে। কোনো পণ্য, সেবা বা ব্যবসায়িক অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। একইভাবে, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারও রয়েছে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, নিজের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার অধিকার।
সমস্যা হলো—আমাদের সমাজে আইন প্রয়োগের নামে অনেক সময় অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—দুই পক্ষের মানবিক মর্যাদার বিষয়টিই যেন হারিয়ে যায়।

আর অভিযোগকারীর নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিক অভিযোগ করার কারণে যদি তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা, ভয়ভীতি কিংবা হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ অভিযোগ করতেই ভয় পাবে। ফলে অনিয়ম বাড়বে, ভোক্তা অধিকার দুর্বল হবে এবং প্রভাবশালীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

তাই সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু কে কাকে মারল—এই প্রশ্নে আটকে না থেকে আমাদের আরও বড় প্রশ্ন তুলতে হবে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা কোথায়?
মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক?
অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত?
শাস্তি কি অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এবং আইন প্রয়োগের নামে কারও মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না—তা দেখার ব্যবস্থা কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।

আমরা চাই না মোবাইল কোর্ট দুর্বল হোক। আমরা চাই না ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের অভিযান বন্ধ হোক। বরং আমরা চাই—আইন আরও শক্তিশালী হোক, কিন্তু তার প্রয়োগ আরও মানবিক হোক।

ক্ষমতা মানে দায়িত্বশীল হওয়া। ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে যে ক্ষমতা রাষ্ট্র দিয়েছে, সেটি জনগণের বিরুদ্ধে নয়—জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য। আর সেই ক্ষমতা প্রয়োগে নিরপেক্ষতা, সংযম, যুক্তিসংগত আচরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি সত্যিই যদি ভিডিওতে প্রতীয়মান চিত্রের মতো হয়ে থাকে, তাহলে সেটির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে উপলক্ষ করে মোবাইল কোর্ট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রমের জন্য আরও সুস্পষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করা দরকার।
কারণ রাষ্ট্রের শক্তি তখনই অর্থবহ, যখন সেই শক্তি দুর্বলকে দমন না করে দুর্বল ও শক্তিশালী—উভয়ের জন্য সমানভাবে আইন নিশ্চিত করে।

একজন সাধারণ নাগরিক যেন অভিযোগ করতে গিয়ে মারধরের শিকার না হন, আবার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও যেন সামান্য ভুলের কারণে জনসম্মুখে অপমানিত না হন—এই ভারসাম্যই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
আইনের শাসন মানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়; আইনের প্রয়োগেও ন্যায়, মর্যাদা ও মানবিকতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন সেই সংস্কৃতির দিকেই এগিয়ে যেতে হবে।
মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন চৌধুরী

ক্যাটাগরি