মঙ্গলবার, ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পার্বত্য সংবাদ

ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক: পাহাড়ের সম্প্রীতি আন্দোলনের এক আলোকবর্তিকা

পরিচয়: পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও সম্প্রীতি আন্দোলনের পুরোধা, প্রথিতযশা প্রকৌশলী এবং ‘সিএইচটি সম্প্রীতি জোট’-এর আহ্বায়ক—ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক বর্তমান সময়ে পাহাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতৃত্বের নাম।

১. পটভূমি ও জাতিসত্তা

ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক ১৯৯৬ সালের ৪ জানুয়ারি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন চাক পাড়ায় এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

তিনি চাক (Chak) সম্প্রদায়ের সন্তান—যা বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক নৃ-গোষ্ঠী। এই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস মূলত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাকেন্দ্রিক। এমন একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং উচ্চশিক্ষা অর্জন তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

২. শিক্ষা ও পেশাগত জীবন

শিক্ষাজীবনের শুরু আলীমিয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ধর্মরাজিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর চট্টগ্রামের একটি কোরিয়ান পরিচালিত এবিএপি হোস্টেলে থেকে ফতেয়াবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।

পরবর্তীতে কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

তার পেশাগত দর্শন শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পাহাড়ের সমাজ ও মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনকে তিনি জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। একজন প্রকৌশলী হিসেবে তার যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়।

৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব

শিক্ষাজীবন থেকেই জাতিগত পরিচয় ও অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। “উপজাতি” শব্দের ব্যবহার নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং এ বিষয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে তিনি উপলব্ধি করেন—তাত্ত্বিক বক্তব্য ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের অ-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে গণঅধিকার পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাহাড় বিষয়ক সীমিত মনোযোগের প্রেক্ষাপটে তিনি “সিএইচটি সম্প্রীতি জোট” প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য পাহাড়ে শান্তি, সহাবস্থান ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।

বর্তমানে তিনি সংগঠনটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার নেতৃত্বে এটি একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

৪. আন্দোলনের মূল দর্শন

তার নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রধান ভিত্তিগুলো হলো—

সাম্প্রদায়িক মৈত্রী: বাঙালি ও অ-বাঙালির মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা
সশস্ত্র রাজনীতির বিরোধিতা: অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান
রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা: সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাস
৫. সাংস্কৃতিক অবদান ও অধিকার রক্ষা

তিনি বিলুপ্তপ্রায় চাক ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ করছেন। পাশাপাশি ছোট নৃ-গোষ্ঠীগুলোর (চাক, ম্রো, খিয়াং প্রভৃতি) অধিকার নিশ্চিত করাকে তার রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।

৬. নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য

তার নেতৃত্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—

নির্ভীকতা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য উচ্চারণ
যৌক্তিকতা: তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাব
গ্রহণযোগ্যতা: বাঙালি ও নৃ-গোষ্ঠী উভয়ের কাছে সম্মানিত
শান্তিবাদী মনোভাব: সংঘাত নয়, সংলাপ ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাস
৭. বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামে উত্তেজনা সৃষ্টির বিভিন্ন প্রচেষ্টার মধ্যে তিনি মাঠপর্যায়ে সম্প্রীতি সমাবেশ, সংলাপ ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

বর্তমানে তাকে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

উপসংহার

ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক কেবল একজন ব্যক্তি নন—তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতময় বাস্তবতায় এক আশার প্রতীক। তার জীবন সংগ্রাম প্রমাণ করে, একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থেকেও মেধা, সাহস ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে তার দর্শন ও নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে।

ক্যাটাগরি