যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন: রাঙামাটিতে স্বামীর ৩ বছরের কারাদণ্ড
মেহেদী হাসান, রাঙামাটি প্রতিনিধি:
যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের মামলায় চিজিমুনি চাকমা (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক।
দণ্ডপ্রাপ্ত চিজিমুনি চাকমা বাঘাইছড়ি উপজেলার বড়আদাম এলাকার বাসিন্দা। তিনি মামলার বাদী নারীর স্বামী।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চিজিমুনি চাকমা মাদকাসক্ত ছিলেন এবং সংসারের খরচ বহন না করে বিভিন্ন সময় স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। মাদক সেবনের জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হতো বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্টের মাঝামাঝি এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় আসামি স্ত্রীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি স্থানীয় কার্বারী আদালতে জানানো হলেও সেখানেও স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী রাঙামাটিতে আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ব্লাস্টের সহযোগিতা নেন।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টার দিকে বাঘাইছড়ির বড়আদামে বাদিনীর পৈত্রিক বাড়িতে মাতাল অবস্থায় যান আসামি। সেখানে তিনি স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন এবং দায়ের করা মামলা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বসতভিটা বিক্রি করে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন।
বাদিনীর অভিযোগ, আসামি তার কাছে ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে বুক ও পিঠে কিল-ঘুষি মারেন এবং ঘর থেকে বের করে দেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে ও ফুলে যাওয়াসহ গুরুতর আঘাত লাগে।
পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি থানায় নিয়ে যান। মামলার নথি অনুযায়ী, সেখানে বিষয়টি পারিবারিক বিরোধ হিসেবে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর রাঙামাটিতে এসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি।
পরবর্তীতে ব্লাস্টের রাঙামাটি ইউনিটের সহায়তায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী। মামলায় কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের পিপি অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ি সমাজে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সমাজব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও যৌতুকের ঘটনা ঘটলেও সামাজিক চাপ, পারিবারিক সমঝোতা ও নানা কারণে অনেক ঘটনা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এ ধরনের রায় নারীদের আইনি প্রতিকার নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহস জোগাবে।
আইনজীবীরা বলছেন, পারিবারিক বিরোধের নামে নারী নির্যাতনকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দিয়ে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যৌতুকের দাবি, শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পাশে পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।