ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো বিনির্মাণই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত – ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
চট্টগ্রাম, ১৮ আগস্ট ২০২৬: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে পরিবর্তন আনার আহ্বানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, চট্টগ্রামের উদ্যোগে আজিমুশশান মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) নগরীর ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ চত্বরে ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি উপলক্ষে আয়োজিত এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ৩টায় শুরু হওয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা হযরত মাওলানা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
প্রধান ওয়ায়েজ হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকার প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী। বিশেষ ওয়ায়েজ হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকার বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি মাওলানা আলী হাসান ওসামা। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সভাপতি ও বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মাওলানা সাইয়েদ মোহাম্মদ আবু নোমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “রাসুল (সা.)-এর সীরাত যত বেশি চর্চা হবে, আমাদের হৃদয় তত বেশি আলোকিত হবে। ইসলাম আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব কোনো ধর্ম নয়; সীরাতের শিক্ষা বাস্তব জীবনে ধারণ করে আমাদের জীবনধারা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের আচার-আচরণ দেখে অন্যান্য জাতি-ধর্মের মানুষকে শিখতে হবে।”
তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা পোশাকে আশেকে রাসুলের পরিচয় দিলেও অনেকের অন্তরে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ নেই। রাসুল (সা.)-এর সীরাত অনুসরণ করলেই কেবল সত্যিকার মুসলিম হওয়া সম্ভব। ঘরে ঘরে কুরআনের তালিম বাড়াতে হবে এবং উম্মাহর ঐক্য জোরদার করতে হবে। দ্বীনের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উম্মাহর কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে।
দেশের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এদেশের বয়স ৫৬ বছর হলেও লুটপাটের মাধ্যমে আমরা দেশকে প্রায় শেষ করে দিয়েছি। ২৮ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকের ভল্ট থেকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে—এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও নেই।” তিনি বলেন, সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু দেশের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মান অর্জন করতে হলে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মদিনার আদর্শভিত্তিক জীবনব্যবস্থা কায়েম না হলে দেশে প্রকৃত শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসবে না।
ড. খালিদ হোসেন আরও বলেন, দলপ্রীতি থাকতে পারে, তবে দলকানা মনোভাব জাতির জন্য সুখকর নয়। কাজ করাটাই আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধান ওয়ায়েজ মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী বলেন, রাসুল (সা.)-এর হৃদয় ছিল সাগরের মতো বিশাল। তাঁর প্রশংসা ও গুণাবলি লিখতে গিয়ে সাগরের সমস্ত পানি কালি হয়ে গেলেও তা শেষ হবে না। একজন আজিম বা শ্রেষ্ঠ মানুষের কাছে একটি আজিম বা শ্রেষ্ঠ কিতাব আল-কুরআন নাজিল হয়েছে। মুসলমানরা শ্রেষ্ঠ জাতি। রাসুল (সা.)-কে শুধু ভালোবাসলেই হবে না, তাঁর আনুগত্যও করতে হবে। আজ মুসলমানরা নানা ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে; উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সবাইকে কাজ করতে হবে।
বিশেষ ওয়ায়েজ মুফতি মাওলানা আলী হাসান ওসামা বলেন, নবীর যুগেও মানুষ কোনটি হক আর কোনটি বাতিল তা জানত; কিন্তু সত্য জানার পরও অনেকে রাসুল (সা.)-কে মেনে নিতে পারেনি। বর্তমানেও অনেকে সত্য ও মিথ্যা জানার পরও সত্য স্বীকার করতে দ্বিধান্বিত হয়। তিনি বলেন, এ দেশের জমিনের প্রতিটি ইঞ্চিতে ইসলাম কায়েম হবেই, ইনশাআল্লাহ। মিথ্যাবাদী ও প্রতারকরা কখনো জাতির প্রকৃত নেতা হতে পারে না। রাসুল (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই তাঁর জাতি তাঁকে সত্যবাদী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তিনি বলেন, অনেক মুনাফিক ভেবেছিল রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলাম শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলাম শাশ্বত। ফেরাউন, নমরুদ, হামান ও আবু জেহেলসহ বহু শক্তি ইসলামকে থামানোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি।
মাহফিলে সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মাওলানা আবু বকর রফিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা গিয়াস উদ্দীন তালুকদার।
এ ছাড়া মাহফিলে বক্তব্য ও আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা আ.ক.ম. আবদুল কাদের, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা আহমদ আলী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মাওলানা শফিউল্লাহ কুতুবী এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রফেসর ড. বি.এম. মফিজুর রহমান আজহারী।
মাহফিলে সম্মানিত আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাঁশখালী শেখেরখীলের হযরত শাহ মাওলানা মুহাম্মদ ইছহাক পীর সাহেব, ফিরোজশাহ্ কলোনি বড় মাদ্রাসার হযরত মাওলানা মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম পীর সাহেব, দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা মকছুদ আহমদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাবেক খতিব হযরত মাওলানা এ.বি.এম. ছিদ্দীকুল্লাহ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাফিজুল হক নিজামী, হযরত মাওলানা আবু ছালেহ মুহাম্মদ ছলিমুল্লাহ, গারাঙ্গিয়া পীর সাহেব হযরত শাহ মাওলানা আনোয়ারুল হক মজিদী, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ মাহমুদুল হক, প্রফেসর মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হারুনুর রশীদ পীর সাহেব (চরকানাই, পটিয়া), হযরত শাহ মাওলানা মুনিরুল মান্নান কুতুবী শাহজাদা (কুতুবদিয়া), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা নেজাম উদ্দিন, হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ মুহসিন ভূইয়া, হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম, বিশিষ্ট সমাজসেবক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী প্রমুখ।
আয়োজকরা জানান, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন, আদর্শ, শিক্ষা ও মানবতার জন্য তাঁর অনন্য অবদান সম্পর্কে আলোচনা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। মাহফিলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ওলামায়ে কেরাম, পীর-মাশায়েখ, বুজুর্গানে দ্বীন ও বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।