মাতামুহুরীর বুকে কল্পজাহাজের বর্ণিল শোভা, সম্প্রীতির উৎসবে একাকার আলীকদম
হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
মাতামুহুরী নদীর ঢেউয়ে ভেসে চলেছে রঙিন কল্পজাহাজ। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, নাচ-গান আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখরিত নদীর দুই তীর। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে বান্দরবানের আলীকদমে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা ও মাহাঃ ওয়াগ্যাই পোয়েঃ উৎসব।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে আলীকদম কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহারের ক্যাং ঘাট থেকে দুটি দৃষ্টিনন্দন কল্পজাহাজ নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে মার্মা সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নেন। রঙিন পোশাকে সজ্জিত অংশগ্রহণকারীদের ঢাক-ঢোলের তালে নাচ-গান ও আনন্দ-উল্লাসে উৎসবস্থল হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
কল্পজাহাজ ভাসানোকে কেন্দ্র করে মাতামুহুরী নদীর তীরে ভিড় করেন হাজারো নারী-পুরুষ। প্রায় দুই ঘণ্টার বর্ণিল আয়োজন শেষে নদীর বুকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় প্রতীক্ষিত কল্পজাহাজ। বাঁশ, বেত ও কাঠের সঙ্গে রঙিন কাগজের নিপুণ কারুকাজে তৈরি জাহাজ দুটি নদীর ঢেউয়ে ভেসে চলার দৃশ্য উপস্থিত দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও ধর্মীয় এই আয়োজনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এ উৎসবে শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষই নন, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও যোগ দেন। তাঁদের পারস্পরিক অংশগ্রহণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ উপস্থিতি আলীকদমের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনকে নতুন করে তুলে ধরে। মাতামুহুরী নদীর তীরে এ আয়োজন যেন বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কল্পজাহাজ ভাসানোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংবাদকর্মী সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, প্রায় দুইশ বছর আগে মিয়ানমারের মুরহন ঘা নামক স্থানের একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন বলে প্রচলিত রয়েছে। প্রবারণা পূর্ণিমায় একত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এ আয়োজন পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষজন। এবারের প্রবারণায় পৃথিবীর সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আলীকদম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আপ্রুমং মার্মা বলেন, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালন করেন। এ সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দায়ক-দায়িকারা অমাবস্যা, পূর্ণিমা ও অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করেন। বর্ষাব্রত চলাকালে ভিক্ষুরা সদ্ধর্ম বিষয়ে অধ্যয়ন, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিন মাসের বর্ষাব্রত শেষে আশ্বিনী পূর্ণিমায় উদ্যাপিত হয় প্রবারণা পূর্ণিমা, যা মার্মা সম্প্রদায়ের কাছে ‘ওয়াগ্যাই পোয়েঃ’ নামে পরিচিত।
প্রবারণা পূর্ণিমার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন এখানেই শেষ হচ্ছে না। পূর্ণিমার পরদিন থেকে বৌদ্ধবিহারগুলোতে শুরু হবে মাসব্যাপী কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সাধনা, দান ও সম্প্রীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।