বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

জোত পারমিটের আড়ালে বন উজাড়: আলীকদমে বিজিবির অভিযানে বিপুল সেগুন কাঠ জব্দ

হাবিবুর রশিদ হিমন,বান্দরবান প্রতিনিধি:

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ‘জোত পারমিট’ (ব্যক্তিগত ভূমির গাছ কাটার অনুমতি)-এর আড়ালে সরকারি বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও পাচারের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আঁতাত করে একটি প্রভাবশালী চক্র বৈধ পারমিটের দোহাই দিয়ে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের কোটি কোটি টাকার মূল্যবান কাঠ সমতলে পাচার করছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। তবে এই অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে বিজিবি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সেগুন গোল কাঠ জব্দ করেছে ৫৭ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। অভিযান চলাকালে বন বিভাগের চরম অসহযোগিতার অভিযোগ উঠায় স্থানীয়দের মাঝে অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জোত পারমিট প্রক্রিয়ায় নিজস্ব ভূমির নির্দিষ্ট পরিমাণ গাছ কাটার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ঘটছে তার উল্টো। জোত সীমানার বাইরে গিয়ে সরকারি রিজার্ভ ফরেস্ট ও প্রাকৃতিক পাহাড়ি বন থেকে নির্বিচারে গর্জন, চম্পা, কড়ই ও গামারিসহ বিভিন্ন প্রজাতির শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। পারমিটে যে পরিমাণ কাঠের উল্লেখ থাকে, মাঠ পর্যায়ের তদারকি না থাকায় তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কাঠ পাচার করা হয়। আলীকদমের পাহাড়ি এলাকা থেকে এসব অবৈধ কাঠ কেটে এনে প্রথমে লামার কয়েকটি কাঠের ডিপোতে মজুদ করা হতো, এরপর ভুয়া ও পুরোনো কাগজপত্র দেখিয়ে তা কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হতো। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, জব্দকৃত এই অবৈধ কাঠের মূল মালিক ওমর ফারুক বেচু নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জোতদার জানান, পারমিট নেওয়ার পর নির্ধারিত ফি ছাড়াও বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ‘উপঢৌকন’ দিতে হয়। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সমঝোতা হওয়ায় অতিরিক্ত গাছ কাটা ও পাচারের বিষয়ে তারা আর কোনো তদারকি করেন না। ফলে কাঠ ব্যবসায়ী চক্রটি পাহাড়ের বুক খালি করে ফেললেও বন বিভাগ দেখেও না দেখার ভান করে আসছে, যার বড় প্রমাণ মিললো বিজিবির সাম্প্রতিক অভিযানে বন বিভাগের অসহযোগিতার মধ্য দিয়ে।

এদিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রাকৃতিক বন উজাড় হতে থাকায় আলীকদমের পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বর্ষাকালে প্রতিনিয়ত পাহাড় ধসের মতো দুর্যোগ ঘটছে।

অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্প্রতি বিজিবির অভিযানে অসহযোগিতা ও কাঠ জব্দের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে আলীকদমের এই জোত পারমিট জালিয়াতির উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পাচারকারী সিন্ডিকেটের মূল হোতাসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল

ক্যাটাগরি