বৃহস্পতিবার, ২৭শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

লামাকে জেলা বাস্তবায়নের দাবিতে গোলটেবিল বৈঠক জেলা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ক্ষোভ, ২১ দিনের স্থগিত জেলা কার্যক্রম পুনর্বহালের দাবি

নজরুল ইসলাম, লামা, বান্দরবানঃ নবগঠিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে লামা উপজেলা থেকে কোনো সদস্য বা প্রতিনিধি না রাখার বিষয়টি এবং দীর্ঘদিনের লামা জেলা বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক থেকে লামার স্থগিত জেলা কার্যক্রম পুনর্বহাল করে দ্রুত লামাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা ঘোষণার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৩টায় লামা প্রেস ক্লাবে লামা উন্নয়ন ও জেলা বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বৈঠকটি লামা থেকে জেলা পরিষদে সদস্য না রাখা এবং লামাকে জেলা করার দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন লামা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক প্রিয়দর্শী বড়ুয়া। উপস্থিত ছিলেন লামা উন্নয়ন ও জেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এম. রুহুল আমিন, সদস্য সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামানসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন নারী সমাজসেবিকা আনোয়ারা বেগম, অ্যাডভোকেট আরিফ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সাদেকুল মাওলা ইরাক, সাংবাদিক নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম খন্দকার, জামায়াতে ইসলামীর আমির কাজী মো. ইব্রাহিম, এনসিপির আহ্বায়ক নাজমুল হাসান, বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন ছাত্র, সামাজিক, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

৮ পৃষ্ঠার খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন

গোলটেবিল বৈঠকে লামা উন্নয়ন ও জেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এম. রুহুল আমিন লামাকে জেলা হিসেবে বাস্তবায়নের দাবির পক্ষে ৮ পৃষ্ঠার একটি খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।

খসড়ায় লামার প্রশাসনিক ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, আয়তন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে লামাকে জেলা হিসেবে বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা এবং এ দাবি বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন তিনি।

উল্লেখ্য, লামা উন্নয়ন ও জেলা বাস্তবায়ন কমিটি দীর্ঘদিন ধরে সাবেক লামা মহকুমাকে প্রশাসনিক জেলা ঘোষণাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন দাবি নিয়ে কাজ করে আসছে। ২০১৮ সালের কমিটি পুনর্গঠনের সময়ও লামাকে প্রশাসনিক জেলা ঘোষণাকে অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

‘২১ দিন জেলা ছিল লামা’

বৈঠকে একাধিক বক্তা বলেন, লামা একসময় জেলা হিসেবে ২১ দিন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। পরবর্তীতে নির্বাহী আদেশে সেই জেলা কার্যক্রম স্থগিত করে লামাকে পুনরায় বান্দরবান জেলার একটি উপজেলায় ফিরিয়ে আনা হয়—এমন দাবি তুলে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লামার মানুষ জেলা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক বৈঠক-সংক্রান্ত প্রতিবেদিতেও ২১ দিন জেলা কার্যক্রম পরিচালনার পর তা স্থগিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বক্তারা বলেন, লামার ভৌগোলিক অবস্থান, আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জেলা বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা স্থগিত জেলা কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে দ্রুত লামাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা ঘোষণার দাবি জানান।

জেলা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় প্রশ্ন

বক্তারা নবগঠিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে লামা উপজেলা থেকে কোনো সদস্য বা প্রতিনিধি না থাকার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য, জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ একটি উপজেলার জনগণের প্রতিনিধিত্ব জেলা পরিষদে না থাকায় স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন দাবি ও স্বার্থ যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ সীমিত হতে পারে।

তারা লামার ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

আইনি পদক্ষেপের কথা বললেন অ্যাডভোকেট ইরাক

বৈঠকে অ্যাডভোকেট সাদেকুল মাওলা ইরাক বলেন, লামাকে জেলা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেসব আইনি জটিলতা রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে এসব বিষয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, লামার ন্যায্য অধিকার ও জেলা বাস্তবায়নের দাবিকে আইনগত ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, দলিলপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান

বক্তারা বলেন, লামাকে জেলা করার দাবি কোনো একক ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের বিষয় নয়; এটি লামার সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। তাই দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে এ দাবি বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে।

এ সময় বক্তব্য দেন সাংবাদিক নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম খন্দকার, এনসিপির প্রতিনিধি, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

বক্তারা লামার উন্নয়ন, জনগণের ন্যায্য অধিকার, জেলা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব এবং জেলা বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দীর্ঘ আলোচনার পর সমাপ্তি

দীর্ঘ আলোচনা শেষে গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি ও লামা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক প্রিয়দর্শী বড়ুয়া সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি লামার উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল বৈঠক থেকে লামার স্থগিত জেলা কার্যক্রম পুনর্বহাল, দ্রুত লামাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা ঘোষণা এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে লামার ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

ক্যাটাগরি