পাম্পে তেল নেই, চুলায় গ্যাস নেই, অফিস-বাসায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নেই, গ্রীষ্মের তাপদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন মো. আবদুল আজিজ
বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এক চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন—সবক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ একটি জনবান্ধব ও নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে টেকসই এবং কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাস ও আমদানিকরা তেলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় লোডশেডিং ও গ্যাস স্বল্পতা প্রকট হয়েছে। এর ফলে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সিস্টেমে লস এবং সব ধরনের দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বসিয়ে রেখে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়ার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে এবং অপচয় রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
শৈশব থেকে আমরা ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাপট দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ দাপট কেবল প্রকৃতির রুদ্ররূপেই সীমাবদ্ধ নেই বরং জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অসহনীয় লোডশেডিং সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম মানেই কাঠফাটা রোদ আর তপ্ত নিঃশ্বাস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই স্বাভাবিক ঋতুচক্রের সাথে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট। পাম্পে তেলের অভাব, রান্নার চুলায় গ্যাসের অনুপস্থিতি আর দিন-রাত জুড়ে বিদ্যুতের লুকোচুরি—সব মিলিয়ে জনজীবন এখন নাভিশ্বাস।
চৈত্র-বৈশাখ আসতেই আকাশের সূর্য যেন অগ্নিবর্ষণ শুরু করে। আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—সবাই এ গরমে দিশেহারা। যখন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, তখন মানুষের ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি মেলে না। তপ্ত দুপুরের লোডশেডিং অসুস্থ বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের যান্ত্রিক জীবনের চাকা সচল রাখে তেল আর গ্যাস। কিন্তু বর্তমানে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দিয়েও অনেক সময় পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে। অন্যদিকে, গৃহিণীদের দুর্ভোগের নাম ‘গ্যাস সংকট’। দিনের পর দিন চুলা জ্বলে না, ফলে ঘরে-ঘরে রান্নার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষ পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।
অফিস-আদালতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাবে কাজের গতি থমকে গেছে। আইপিএস বা জেনারেটরের ব্যাকআপও বেশিক্ষণ টিকছে না। তীব্র গরমে বাসায় ফিরে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি বা একটু ফ্যানের বাতাস পাওয়ার নিশ্চয়তাটা আজ অনিশ্চিত। বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ার খেলায় মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, যা দৈনন্দিন কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে এ সংকট যোগ হয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস আজ রাজপথ থেকে শোবার ঘর—সবখানেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি হলো আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড। একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, তাই তারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই সংকট নিরসনে অধিকতর সফল হতে পারে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে অন্ধকার কাটিয়ে দেশকে আলোর পথে নিয়ে যেতে। প্রকৃতির পরিবর্তন আমাদের হাতে নেই, কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। গ্রীষ্মের এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বণ্টন এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের কার্যকর ব্যবহার। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস আগামীর উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন, সিটিজি টাইমস ও চ্যানেল কর্ণফূলী।