শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

হালাল উপার্জন ছাড়া হজ্ব সহ কোন ইবাদত কবুল হয় না মো: আব্দুল আজিজ

হজ্ব হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোচ্চ মাধ্যম। কিন্তু তা যদি হারাম উপার্জনের (যেমন: সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি) টাকায় করা হয়, তবে তা শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হবে না [৩, ১৪]। তাই হজ্বে যাওয়ার আগে অবশ্যই নিজের সম্পদ হালাল ও পবিত্র কি না, তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য।
হজে গিয়ে সেলফি বা ভিডিও নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকা ইবাদতের একনিষ্ঠতা(ইখলাস) নষ্ট করে এবং হজের রূহ বা মূল চেতনাকে ধ্বংস করে দেয় । যদিও ছবি তোলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হজ বাতিল করে না, তবে এটি লোকদেখানো প্রবণতা (রিয়া) সৃষ্টি করে, যা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তাই সেলফিমুক্ত হজ পালন করাই উত্তম।
সেলফি ও ভিডিও করার কারণে হাজিরা ইবাদত বা দোয়া-কালামে মনোনিবেশ করতে পারেন না ।
লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া তৈরি হয়, যা ইবাদত কবুল হওয়ার পথে বড় বাধা ।
পবিত্র কাবার আঙিনায় বা ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে সেলফির পেছনে সময় দেওয়া পর্যটকের মতো আচরণ, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত ।
রাসূল (সা.) হজের সময় দম্ভ ও লোকদেখানো থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন, যা বর্তমান সেলফি সংস্কৃতির পরিপন্থী । হজ জীবনের একটিই বড় সুযোগ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এই পবিত্র সময়ে ছবি তোলা বা সেলফি নেওয়ার বদলে আল্লাহর জিকির, ইবাদত এবং একাগ্রতার সাথে হজ পালন করা উচিত। এমন কোনো কাজ করা ঠিক নয় যা হজের পুণ্য কমিয়ে দেয় বা নষ্ট করে

হালাল রিজিক ভক্ষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের হালাল রিজিক ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে রাসুলরা! তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং নেক কাজ করো।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৫১)।
এই নির্দেশ শুধু নবী-রাসুলদের জন্য নয়, বরং সব ঈমানদারের জন্য এই নির্দেশ প্রযোজ্য। কারণ হালাল রিজিক ভক্ষণ করা ছাড়া ইবাদত কবুল হয় না।
আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায় না। এমনকি জান্নাতেও যাওয়া যায় না।রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওই গোশত (দেহ) জান্নাতে যাবে না, যা হারাম (খাবার) থেকে উৎপন্ন। জাহান্নাম এর উপযোগী।’ (মুসনদে আহমদ, দারেমি)।
কিছু হারাম উপার্জন তো মানুষকে শুধু আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে না, বরং তাদের আল্লাহর শত্রæতে রূপান্তর করে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, হাদিস : ২৭৮-২৭৯)।

তাই মুমিনের উচিত নিজেকে সুদ, ঘুষ, অন্যায়ভাবে আত্মসাৎকৃত অর্থসহ সব ধরনের হারাম উপার্জন থেকে দূরে রাখা। এতে কেউ না খেয়ে মৃত্যুবরণ করবে না। কারণ প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব মহান আল্লাহর।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল। সব কিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)।

পৃথিবীতে মোট কত প্রজাতির প্রাণী আছে, তার সঠিক সংখ্যা অনুমান করা দুষ্কর। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে ১০ মিলিয়নেরও বেশি প্রাণী প্রজাতি বিদ্যমান। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৩ লাখ (১.৩ মিলিয়ন) প্রজাতি শনাক্ত বা বর্ণনা করা হয়েছে। এমন অনেক প্রাণী আছে, যেগুলোর ব্যাপারে মানুষের ধারণাই নেই।
মানুষের সবচেয়ে পরিচিত প্রাণীগোষ্ঠী হলো পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি থাকতে পারে। আর চার হাজার ৫০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী থাকতে পারে।

মহান আল্লাহর সৃষ্টি এই বিশাল প্রাণিকুল কোনো ধরনের সুদ, ঘুষ, চাঁদাবাজি ছাড়াই নিয়মিত রিজিক ভোগ করে যাচ্ছে। এমন এত পরিমাণ রিজিক ভোগ করে যাচ্ছে, যা আমাদের কল্পণার পরিধি থেকে বহু দূরে। এই যেমন নীল তিমির কথাই ধরা যাক। একে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত বসবাসকারী সবচেয়ে বড় প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একটি নীল তিমির দৈর্ঘ্যে হতে পারে প্রায় ১০০ ফুট (৩০ মিটার) এবং ওজনে ২০০ টনেরও বেশি। শুধু একটি নীল তিমির জিভের ওজনই হাতির সমান হতে পারে। আর তার হৃৎপিÐের ওজন প্রায় একটি গাড়ির সমান। মহান আল্লাহ তাঁর এই বিশাল প্রাণীকে দৈনিক চার টন ক্রিল খাওয়ান। ক্রিল হলো চিংড়ির মতো ক্ষুদ্রাকৃতির একটি প্রাণী। সাগরে এ রকম কী পরিমাণ নীল তিমি আছে, তার সঠিক হিসাব আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

এবার আসি স্থলে, অনেকের মতে, স্থলচর প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাবার খায় আফ্রিকান হাতি। আফ্রিকান হাতি সব ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার খায়; ঘাস, ফল, পাতা, শিকড় এবং গাছের বাকল পর্যন্ত খায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একেকটি আফ্রিকান হাতি প্রায় ৭৫ থেকে ১৫০ কেজি খাবার খায়। এরা দিনে গড়ে ১৬ ঘণ্টা শুধু খাবার খেতেই ব্যয় করে!

তথ্যমতে, পৃথিবীতে এই জাতের হাতির সংখ্যা আনুমানিক চার লাখ ১৫ হাজার। যদিও এর সঠিক হিসাব কারো জানা থাকার কথা নয়। এ রকম বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি প্রাণীকে তিনি দৈনিক রিজিক দিয়ে যাচ্ছেন, খাবারসহ তাদের জীবনের সব প্রয়োজন মিটিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের কোনো সুদ-ঘুষ খেতে হয় না, হারাম উপার্জন করতে হয় না।
মানুষও যদি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে হারাম থেকে বাঁচতে চায়, তাহলে মহান আল্লাহ তাকে অবশ্যই অপ্রত্যাশিত রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন, যা সে কল্পনাও করেনি।

হজ্ব মানুষকে বিনয়, সহনশীলতা এবং ত্যাগের শিক্ষা দেয়। যখন একজন হাজি সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় (ইহরাম) পরিধান করেন, তখন ধনি-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সব ভেদাভেদ ঘুচে যায়। সবাই তখন এক আল্লাহর দাস হিসেবে একই কাতারে দাঁড়িয়ে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (হে আল্লাহ, আমি হাজির) ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন।

হজ্ব হলো ঈমানের নবায়ন এবং জান্নাত লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। তবে এই সফরের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত ধৈর্য ও একাগ্রতার দাবি রাখে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর ঘরের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন এবং প্রত্যেক হাজিকে সহিহ ও কবুল হজ্ব (হজ্বে মাবরুর) নসিব করুন। আমীন।
লেখক: চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন, সিটিজি টাইমস ও চ্যানেল কর্ণফলী

ক্যাটাগরি