বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

শান্তি ও মানবিকতার দর্শন: বিশ্ব দরবারে মাইজভাণ্ডারী সূফীবাদ

বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিপরীতে আধ্যাত্মিক মুক্তি ও মানবিক সমাজ গঠনের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাইজভাণ্ডারী সূফীবাদ। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এই পুণ্যভূমি থেকে উৎসারিত এই দর্শন আজ কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অসাম্প্রদায়িকতা ও আধ্যাত্মিক জাগরণের এক অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে। এটি এখন বিশ্বশান্তির এক আধ্যাত্মিক প্রেসক্রিপশন হিসেবে স্বীকৃত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল ভিত্তি
মাইজভাণ্ডারী তরীকার প্রবর্তক গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.)-এর হাত ধরে এই ধারার সূচনা হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন সমাজ নানা কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বিভাজনে জর্জরিত ছিল, তখন তিনি প্রচার করেন ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ার দর্শন। এই তরীকার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া। হযরত আহমদ উল্লাহ (ক.)-এর পর গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ গোলাম রহমান (ক.) প্রকাশ শাহ্ বাবা ভাণ্ডারী এই তরীকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা আজ ‘বেলায়তে মোতলাকা’ বা নিরঙ্কুশ আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ধারা হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

আধ্যাত্মিক বিবর্তন ও সপ্তপদ্ধতি
মাইজভাণ্ডারী দর্শনের একটি অনন্য বৈজ্ঞানিক দিক হলো ‘সপ্তপদ্ধতি’ (Seven Methods)। মানুষের রিপু বা কুপ্রবৃত্তি দমনের জন্য এই সাতটি পদ্ধতি হলো আত্মশুদ্ধির মূল চাবিকাঠি। যার মধ্যে রয়েছে— পরনিন্দা বর্জন, অন্যের মুখাপেক্ষী না হওয়া, লোভ লালসা ত্যাগ এবং নিরন্তর জিকিরের মাধ্যমে কালব বা হৃদয়কে জাগ্রত করা। এটি কেবল তসবিহ পাঠ বা নির্জনে ধ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও সংসারের ভেতরে থেকে নিজেকে শুদ্ধ করার এক বাস্তবমুখী শিক্ষা। এটি শেখায় কীভাবে কোলাহলের মাঝে থেকেও স্রষ্টার সাথে সংযোগ রক্ষা করা যায়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বিশ্বশান্তি
মাইজভাণ্ডারী সূফীবাদের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন আবেদন। ফটিকছড়ির এই দরবার সকল ধর্মের মানুষের জন্য একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ‘গোলামে মাওলা’ হওয়ার এই দর্শনে মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন মাইজভাণ্ডারী উদারনৈতিক চিন্তা এক কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করছে। অনেক গবেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের কঠোর সূফী ধারার বিপরীতে মাইজভাণ্ডারী তরীকা অনেক বেশি উদার ও মানবিক, যা বাংলার হাজার বছরের সহজিয়া সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে।

সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের ধারক
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সংগীতে মাইজভাণ্ডারী ধারার অবদান অপরিসীম। মাইজভাণ্ডারী গান বা মরমি সংগীত আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই সংগীতের সুর ও বাণীতে যে নিগূঢ় তত্ত্ব থাকে, তা অতি সাধারণ মানুষের হৃদয়েও স্রষ্টাপ্রেম এবং সাম্যের বাণী সহজে পৌঁছে দেয়। রমেশ শীল থেকে শুরু করে সমসাময়িক অনেক সাধক এই ধারার সংগীতকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং রুহের খোরাক ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবকল্যাণ
মাইজভাণ্ডারী তরীকা কেবল আধ্যাত্মিক তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আর্তমানবতার সেবায় এক বিশাল ভূমিকা রাখছে।শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্ট,গাউসিয়া হক কমিটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মঈনীয়া মঈনুল এহসান ট্রাস্ট ও হাশেমীয়া মনজিল ও লতিফিয়া-হাশেমীয়া পরিষদ’র মাধ্যমে সারাদেশে শিক্ষা বিস্তার, হাসপাতাল পরিচালনা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে লাশ দাফন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ফটিকছড়িসহ সারাদেশে এই ধারার অনুসারীদের মানবিক ভূমিকা দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মাইজভাণ্ডারী সূফীবাদ মূলত একটি জীবনমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মতত্ত্ব। এটি মানুষকে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শেখায়। এটি শেখায় যে, স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ পথ হলো তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসা। বর্তমান পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসনে এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় মাইজভাণ্ডারী দর্শনের এই ভ্রাতৃত্ব ও সহনশীলতার শিক্ষা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অপরিহার্য পাথেয় হতে পারে। ফটিকছড়ির এই পুণ্যভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়া নূরের আভা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা।

মীর মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান রুবেল
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী

ক্যাটাগরি