সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

শিক্ষার ধারাবাহিকতা সংকটে: মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে করণীয় — এম নজরুল ইসলাম খান

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তি প্রায় সর্বজনীন, নারী শিক্ষায় দৃশ্যমান উন্নতি এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অগ্রগতি মূলত সংখ্যাগত; শিক্ষার গুণগত মান এখনও আন্তর্জাতিক মানের নিচে রয়ে গেছে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি, দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান, সুশাসন, মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা। বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি নীরব সংকটের মুখে পড়েছে।

সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা
গবেষণায় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী গড়ে ১১ বছর পড়াশোনা করলেও তার শেখার দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে ৬–৭ বছরের সমতুল্য। প্রাথমিক স্তরের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়তে পারে না এবং মৌলিক গণিতে দুর্বল। এ অবস্থা একটি স্পষ্ট “লার্নিং ক্রাইসিস” তৈরি করছে, যা ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বাধা।

মহামারীর প্রভাব
COVID-19 মহামারীর সময় দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি বেড়েছে, ড্রপআউট হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডিজিটাল বৈষম্য তীব্র হয়েছে। অনলাইন শিক্ষা চালু থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এর সুফল পায়নি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শিক্ষাবিঘ্ন
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়মিত ঘটনা। অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয় বা আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। ফলে নির্ধারিত শিক্ষাদিবস কমে যায়।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পরিবহন সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে এবং শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।

শিক্ষক সংকট ও অতিরিক্ত দায়িত্ব
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং পেশাগত অনুপ্রেরণার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাশাপাশি নির্বাচন, আদমশুমারি ও বিভিন্ন জরিপে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা তাদের মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করছে।

পরীক্ষানির্ভরতা ও পাঠদান ব্যাহত হওয়া
বছরের বড় সময় পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। যদিও বছরে ২০০–২২০ দিন শিক্ষাদিবস নির্ধারিত থাকে, বাস্তবে কার্যকর ক্লাস হয় মাত্র ১২০–১৪০ দিন।

প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
পাঠ্যপুস্তক বিতরণে বিলম্ব, সিলেবাস ও মূল্যায়নে অনিশ্চয়তা এবং ভর্তি নীতির পরিবর্তন অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমায়।

সমাধানের পথ

রাষ্ট্রের করণীয়:

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি
শিক্ষকদের অপ্রাসঙ্গিক দায়িত্ব কমানো
দুর্যোগকালীন হাইব্রিড শিক্ষা ব্যবস্থা চালু
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা (রেমেডিয়াল শিক্ষা)

অভিভাবকদের ভূমিকা:

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা
শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে উৎসাহ দেওয়া

শিক্ষার্থীদের করণীয়:

মুখস্থ নয়, বোঝার মাধ্যমে শেখা
আত্মশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া

শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়; এটি একটি জাতির মানসিক, নৈতিক ও সৃজনশীল ভিত্তি গঠনের প্রধান মাধ্যম। তাই যেকোনো সংকটে শিক্ষা বন্ধ না রেখে তা সচল রাখার কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। শিক্ষা এমন এক শক্তি, যার মাধ্যমে একটি জাতি সব বাধা অতিক্রম করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

(লেখক: প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক, চট্টগ্রাম মডেল স্কুল; মহাসচিব, বাংলাদেশ সাংবাদিক ক্লাব

ক্যাটাগরি