বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে অগ্নিকান্ড বাড়ছে সচেতনতা জরুরী

বিগত ৫ বছরে দেশে অগ্নিকান্ডের ঘঠনা লক্ষাধিক। বাংলাদেশে এই সময়টা হচ্ছে অগ্নিকান্ডের সময় । গত ২৩ ফেব্রুয়ারী সোমবার ভোরে হালিশহর এইচ ব্লকের এসি মসজিদ সংলগ্ন ছয়তলা ভবন ‘হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল পাঁচজন। নিহত ও আহতরা সবাই একই পরিবারের সদস্য । বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেঁচে থাকা চারজনের শরীরেরও বড় একটি অংশ পুড়ে যাওয়ায় তাদের জীবন রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই বাসার রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস জমে ছিল এবং ভোরের দিকে আগুনের সংস্পর্শে আসতেই তা প্রচণ্ড শক্তিশালী বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

অপরদিকে (২৬ ফেব্রুয়ারি) বুধবার রাত ৮ টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস লিকেজ থেকে এমন ঘটনা ঘটে বলে জানায় স্থানীয়রা। এতে পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যায় মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল।
স্থানীয়রা জানান, গ্যাস লিকেজ থেকে হোঁট করে বিস্ফোরণে আশপাশের কয়েকটি জীপ বিস্ফোরিত হওয়ার পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ হয় বেশ কয়েকজন। তাদেরকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উপরের দুইটি ঘঠনাই শেষ নয় ।

গবেষনায় দেখাযায় গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের ছিদ্র বা লিকেজ থেকে সারাদেশে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে মৃত্যু, দগ্ধ এবং ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এ ছাড়া পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটছে।
দগ্ধদের বেশির ভাগের ভাষ্য, তারা ঘরে গ্যাস লিকেজ টের পাননি। চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং মুহূর্তের মধ্যে শরীরে আগুন ধরে গেছে।

২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের বছর ঘটেছে ৭৪৮টি। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাত ও নিরাপত্তা-মান পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের তিন তদারক সংস্থা নির্বিকার।

গ্রাহকদের সচেতনতার ঘাটতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নির্বিকার ভূমিকার কারণে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সঠিক নিয়মে সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল না করা, মানহীন সুরক্ষা যন্ত্রাংশ ব্যবহার, সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ বোতল, চুলার পাশে সিলিন্ডার রাখা দুর্ঘটনার বড় কারণ।

অভিজ্ঞরা বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে হয়। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল, ভালভের কারণে লিকেজ হয়। এ ছাড়া নানা কারণে ঘরে জমে থাকা গ্যাসের গন্ধ এখন তেমন টের পাওয়া যায় না। আগুন জ্বালানো মাত্র বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা। তিনি বলেন, নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ হয়। সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার দায় রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে এক হাজার ২০৭টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে ১৩৫, ২০২১ সালে ১০৫, ২০২২ সালে ৯৪, ২০২৩ সালে ১২৫টি ও ২০২৪ সালে ৭৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি মাসে ৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে সারাদেশে সিলিন্ডার ও এর সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, মাসে গড়ে ৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকে ২০২৫ সালে ৫৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের পাঁচ বছরে (২০২০ থেকে ২০২৪ সাল) এ সংখ্যা তিন হাজার ৫৪১। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৭২২, ২০২১ সালে ৭৮৯, ২০২২ সালে ৭৯৫, ২০২৩ সালে ৭৭০, ২০২৪ সালে ৪৬৫ ও ২০২৫ সালের ৫৬২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরে সারাদেশে বিভিন্ন কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজার ৬৮৯টি। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে। ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পাঁচ বছরে গ্যাস সিলিন্ডার এবং পাইপলাইনের লিকেজ থেকে দুর্ঘটনায় যথাক্রমে ২৭ ও ৩৪ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন যথাক্রমে ২৫৬ ও ১৯৩ জন। তবে বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে যেসব লাশ পান, সেসব তথ্য তারা রেকর্ড করেন। দগ্ধদের মধ্যে পরে চিকিৎসাধীন অনেকেই মারা গেলেও, এ তালিকায় স্থান পান না।

আগুনে পোড়া অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নেন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ে সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস লিকেজ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন যথাক্রমে ১২১ ও ৬২ জন।
গত বছরের ১৯ এপ্রিল মতিঝিলের ফকিরাপুলের গরম পানির গলিতে একটি বাসায় সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুন লেগে তিনজন দগ্ধ হন। স্বজন জানান, রান্নার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়।

রাজধানীর বংশালের বাংলাদেশ মাঠে ঈদ উপলক্ষে বসানো মেলায় ফাস্টফুডের দোকানে গত বছর ৩১ মার্চ রাতে একটি সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়। এতে ছয়জন দগ্ধ হন।
চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২০ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে সিলিন্ডার লিকেজে ১৫৫ ও পাইপলাইনজনিত কারণে ৬৯৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর অদূরে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় দেড় বছরে সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস লিকেজের ৩৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩ জন নিহত ও অন্তত ৪২ জন আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেই দায় সারে স্থানীয় প্রশাসন।

রংপুর ফায়ার সার্ভিস জানায়, বিভাগের আট জেলায় গত বছরের প্রথম ৯ মাসে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
খুলনা বিভাগে গত বছরের প্রথম ৯ মাসে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৮৬টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকে দগ্ধ হন। একজনের মৃত্যু হয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির জন্য বিস্ফোরক লাইসেন্স আবশ্যক। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ বিক্রেতার কোনো লাইসেন্স নেই। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনো ঘটনার পর প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করে দায় সারেন।

বরিশাল বিভাগে পাইপলাইনের গ্যাস নেই। গৃহস্থালিসহ সব ধরনের কাজে সিলিন্ডার ব্যবহৃত হয়। ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় দপ্তর সূত্র জানায়, গত বছর প্রথম ৯ মাসে বিভাগের ছয় জেলায় ৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ২০২১ সাল থেকে চার বছরে এ সংখ্যা ৯৫
চট্টগ্রামে প্রায় চার কোটি মানুষের জন্য একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) ৬০ শয্যার ইউনিটে আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হয়।

অগ্নিকাণ্ড বর্তমান সময়ের এক ভয়াবহ দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে আমাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা সম্পদ এবং অমূল্য জীবন ছাই করে দেয়। অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচতে একদিকে যেমন বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক সচেতনতা প্রয়োজন, তেমনি মুমিন হিসেবে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা অপরিহার্য।
ইসলাম আমাদের প্রতিটি কাজে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আগুন তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা যখন ঘুমাতে যাবে, তখন তা নিভিয়ে দেবে” ।

আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব। বরং প্রয়োজনীয় সকল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাটাই হলো ইসলামের শিক্ষা। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া এবং সাধ্যমতো আগুন নেভানোর চেষ্টার পাশাপাশি দোয়া ও ইস্তেগফার আমাদের মানসিক শক্তি যোগায় এবং বিপদ থেকে রক্ষা করে।লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন, চ্যানেল কর্ণফুলী ও সিটিজি টাইমস।

ক্যাটাগরি