বিদায়বেলায় স্মৃতিতে লামা পৌরসভা, সংকট মোকাবিলায় প্রশাসক মঈন উদ্দিনের ভূমিকা
নজরুল ইসলাম, লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবানের লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও লামা পৌরসভার প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বদলি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় যাচ্ছেন। তাঁর বদলির মধ্য দিয়ে লামায় দায়িত্ব পালনের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। এদিকে তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে লামা পৌরসভার আর্থিক সংকট মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব আদায়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে।
একসময় আর্থিক সংকট, বিপুল পরিমাণ দেনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের চাপে থাকা লামা পৌরসভায় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পৌরসভা-সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের কিছু দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং নিয়মিত বেতন পরিশোধের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আটকে থাকা সরকারি জিপিএফ (GPF) ও সিপিএফ (CPF) তহবিলের ২৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার বকেয়া বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। বিদ্যুতের অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে ১৮টি অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (BMDF) ঋণ বাবদ ৯ লাখ টাকা এবং জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত বকেয়া ফি বাবদ ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এসব দেনা পরিশোধের পাশাপাশি পৌরসভার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে পৌরসভার মোট দেনার পরিমাণ বর্তমানে কত এবং সব দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হালনাগাদ আর্থিক হিসাব প্রয়োজন।
নিয়মিত বেতনে স্বস্তি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন ছিল বড় সমস্যা। আগে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে নিয়মিত বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে বলে পৌরসভার কর্মীরা জানিয়েছেন।
পৌরসভার দারোয়ান রাজিব মল্লিক বলেন, আগে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। এখন নিয়মিত বেতন পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক কষ্ট অনেকটাই কমেছে।
এ ছাড়া পৌরসভার প্রয়াত এক কর্মকর্তার পরিবারের বকেয়া পাওনা বাবদ ৯ লাখ টাকা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতির দাবি
পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ৫৮ লাখ ২১ হাজার ৮০৪ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স বাবদ ১০ লাখ টাকা এবং নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা খাত থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।
এ ছাড়া দোকানভাড়া বাবদ ৭ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৯ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে।
ভূমি উন্নয়ন কর আদায়েও অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা আদায় হয়। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আদায় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত কর আদায়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বকেয়া নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে পৌরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
সামাজিক ও অবকাঠামোগত কাজেও সহায়তা
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বিলছড়ি সিলেটি পাড়া জামে মসজিদের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান পাড়া এলাকার পানির ট্যাংকি মসজিদের চাল মেরামতে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পৌরসভার নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং নাগরিক সেবার বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করাও প্রশাসকের দায়িত্বের অংশ ছিল।
পরিবর্তনের পেছনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা
লামা পৌরসভার কর নির্ধারক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অপচয় বন্ধের মাধ্যমে একটি ঋণগ্রস্ত পৌরসভাকে পুনরায় সচল ও স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
নিজের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “সরকার আমাকে জনগণের সেবা করার লক্ষ্যেই পাঠিয়েছে এবং আমি অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। লামা পৌরসভার এই দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সহায়তা এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মাধ্যমে।”
তাঁর বক্তব্যে পৌরসভার পরিবর্তনের পেছনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা ও নাগরিকদের কর পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. মঈন উদ্দিন। দায়িত্ব পালনকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি), রেজিস্ট্রেশন অফিসার ও নির্বাহী আদালতের বিচারক—এমন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এবার বদলি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় যাচ্ছেন তিনি। লামায় তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে নেওয়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক উদ্যোগগুলো কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী প্রশাসনের ধারাবাহিক কার্যক্রম, রাজস্ব আদায় এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর।
বিদায়বেলায় তাই লামা পৌরসভার আর্থিক সংকট মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলো যেমন আলোচনায় রয়েছে, তেমনি নতুন কর্মস্থলে তাঁর পরবর্তী দায়িত্ব পালনের দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।