পাহাড়ে টেন্ডারবাজি থেকে কলকাতায় ফ্ল্যাট: দুদকের জালে বান্দরবানের আওয়ামী নেতা লক্ষ্মীপদ দাশ
হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
টানা দুই মেয়াদে জেলা পরিষদের সদস্যপদকে হাতিয়ার করে পাহাড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছিলেন আওয়ামী লীগের বান্দরবান জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মীপদ দাস। সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ইটভাটা থেকে চাঁদা আদায় আর প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে খুব অল্প সময়েই তিনি ও তার স্ত্রী সীমা দাস অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এ দম্পতি দেশ-বিদেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। তাদের এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সাম্রাজ্যের খোঁজে এবার আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ইতোমধ্যেই লক্ষ্মীপদ ও সীমা দাসের যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও নথিপত্র তলব করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যাংকে চিঠি পাঠানো শুরু করেছে দুদক। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছেও তাদের যাবতীয় তথ্য চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ জানান, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
দুদকের প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের এলজিইডি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিএডিসি বিভাগের অধিকাংশ বড় বড় কাজ নিজের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন লক্ষ্মীপদ। শুধু টেন্ডারবাজিই নয়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করার কথা বলে পুরো জেলার অবৈধ ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এমনকি সুয়ালক এলাকায় তিনি নিজে একটি অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করতেন বলেও নথিপত্রে উঠে এসেছে।
প্রভাব আর অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত এই অর্থ দিয়ে বান্দরবান শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে অন্যান্য লাভজনক এলাকায় বিশাল ভূসম্পত্তি গড়ে তুলেছেন এই দম্পতি। জেলা সদরের রাজারমাঠের পাশে চোখধাঁধানো এক বাসভবনের পাশাপাশি বালাঘটায় পাসপোর্ট অফিসের কাছেই রয়েছে তাদের কোটি টাকা মূল্যের ১৬ শতক জমি। কালাঘাটায় প্রায় দেড় কোটি টাকা দামের এক একর জমি ছাড়াও রেইচা চিনিপাড়া ও লেমুঝিরি এলাকায় তাদের নামে-বেনামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিপুল জমি। বান্দরবান শহরেই স্ত্রী সীমা দাসের নামে কেনা হয়েছে কোটি টাকার দুটি পৃথক প্লট। স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকা এবং ভারতের নামীদামি এলাকাগুলোতেও একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক এই দম্পতি।
নথিপত্রে উঠে এসেছে তাদের বারবার বিদেশ গমনের উদ্বেগজনক তথ্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়েও সীমা দাস ৭ বার এবং লক্ষ্মীপদ দাস ১৩ বার বিদেশে গেছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট পেশাগত কারণ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর ২০ বার বিদেশে যাতায়াতকে কেবল ভ্রমণ হিসেবে দেখছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, ভ্রমণের আড়ালে হুন্ডি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন তারা।
দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে অনুসন্ধানের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই লাপাত্তা রয়েছেন এই দম্পতি। বারবার চেষ্টা করা হলেও তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।