নবীজি (সা.)-এর সংগ্রামময় জীবন আমাদের প্রেরণার উৎস
নবী করিম (সা.)-এর পুরো জীবনই আমাদের প্রেরণার উৎস, সঠিক পথের দিশা। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি পথচলাই আমাদের অনুসরণীয়। তাঁর জীবনযাপন, আচার-আচরণ, আনন্দ-বেদনা, সংকট ও সাফল্য-সবকিছুতেই রয়েছে আমাদের পাথেয়। তন্মধ্যে তাঁর সংগ্রামময় জীবন আমাদের জন্য প্রেরণার এক অনন্য উৎস।
আমরা যখন জীবনের নানা সংকট, অভাব ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হই, নবীজি (সা.)-এর জীবন তখন আমাদের আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখায়। এহেন কোনো সংকট বা প্রতিকূলতা নেই, যার মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়নি। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল, আদর্শে অবিচল এবং অসীম ধৈর্যের অধিকারী।
তাঁর সংগ্রামময় জীবনের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, একজন মুমিনের কীভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের বিশ্বাস, দায়িত্ব ও আদর্শে অটুট থাকতে হয়। কীভাবে কষ্টকে ধৈর্যের মাধ্যমে ধারণ করতে হয়, ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, শত্রুতার মধ্যেও ন্যায় ও মানবিকতা ধরে রাখতে হয় এবং বিজয়ের পরও বিনয়ী থাকতে হয়। নবীজি (সা.)-এর জীবনচরিত এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।
নবীজি (সা.)-এর সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তাঁর জন্মের আগেই, পিতাকে হারানোর মধ্য দিয়ে। এরপর শৈশবে স্নেহময়ী মা এবং পরম শ্রদ্ধেয় দাদা আবদুল মুত্তালিবকে হারিয়ে তিনি যে চরম একাকিত্বের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা ছিল তাঁর ধৈর্য ও মানসিক শক্তির প্রথম পরীক্ষা। পার্থিব কোনো অবলম্বন না থাকলেও শুধু মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে একজন মানুষ কীভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারে, তাঁর শৈশবই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর যখন তিনি মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন থেকে তাঁর ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতনের স্টিমরোলার। যে মক্কাবাসীরা তাঁর সততা ও চারিত্রিক মাধুর্যের কারণে তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেছিল, তারাই তাঁর ঘোরতর শত্রুতে পরিণত হলো। তাঁর পথে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া, পাগল ও জাদুকর বলে উপহাস করা এবং শারীরিক কষ্ট দেওয়া মক্কাবাসীদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এমনকি তিনি যখন পবিত্র কাবার সামনে সেজদায় যেতেন, তখন তাঁর ঘাড়ের ওপর উটের পচা ও ভারী নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হতো। এই চরম অবমাননা ও শারীরিক লাঞ্ছনা সত্ত্বেও তিনি একমুহূর্তের জন্য সত্যের প্রচার থেকে বিচ্যুত হননি।
নবীজি (সা.)-এর জীবনের কঠিনতম সময় ছিল নবুওয়াতের দশম বছর, যাকে ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছর বলা হয়। এই এক বছরেই তিনি তাঁর জীবনের দুই প্রধান আশ্রয়-সহধর্মিণী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবকে হারান। ঘর এবং বাইরের এই দুই পরম আশ্রয় হারিয়ে তিনি যখন চরম বিষাদগ্রস্ত ও একা বোধ করছিলেন, তখনো তিনি হিমালয়ের মতো অটল। এর আগে কুরাইশরা যখন তাঁকে কোনোভাবেই দমাতে পারল না, তখন তারা তাঁকে এবং তাঁর বংশের লোকজনকে দীর্ঘ তিন বছর ‘শিআবে আবি তালিবে’ অবরুদ্ধ করে রাখে। সেই নির্বাসিত জীবনে খাদ্য ও পানীয়র অভাবে সাহাবিরা গাছের ছাল এবং শুকনো চামড়া চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন। এই ত্যাগের ইতিহাস আমাদের শিখিয়ে দেয়-কীভাবে চরম অভাব ও দারিদ্র্যের মাঝেও নীতি ও আদর্শ রক্ষা করতে হয়।
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ছিল তাঁর সংগ্রামের আরেক কালজয়ী অধ্যায়। নিজের প্রিয় জন্মভূমি ও স্বজনদের ছেড়ে আসার বেদনা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কিন্তু মদিনায় পৌঁছেও তিনি বিশ্রামের সুযোগ পাননি। সেখানে তাঁর সামনে ছিল হাজার হাজার নিঃস্ব মুহাজির সাহাবির আবাসন ও খাদ্যের বিশাল চ্যালেঞ্জ। মদিনার সমাজ ছিল তখন বিভিন্ন গোত্রীয় দ্বন্দ্বে জর্জরিত। নবীজি (সা.) সেখানে ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন। তিনি একজন মদিনাবাসীর (আনসার) সঙ্গে একজন মক্কাবাসীকে (মুহাজির) ভাই-ভাই হিসেবে যুক্ত করে দিলেন। এর ফলে আনসার সাহাবিরা তাঁদের ঘরবাড়ি ও সম্পদের অর্ধেক মুহাজির ভাইদের সানন্দে বিলিয়ে দিলেন। আধুনিক বিশ্বের শরণার্থী সমস্যার সমাধানে নবীজি (সা.)-এর এই ভ্রাতৃত্ব নীতি আজও এক বিস্ময়কর উদাহরণ। তিনি কেবল ধর্মের প্রচারক ছিলেন না, ছিলেন এক মহান সমাজ সংস্কারক।
সাফল্যের পথ কখনো মসৃণ হয় না, ত্যাগের কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। আজ যখন আমরা ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংকটে দিশাহারা হয়ে পড়ি, তখন নবীজি (সা.)-এর সংগ্রামময় জীবন আমাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। তাই নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, বরং তাঁর প্রতিটি পাঠ থেকে শিক্ষা নিয়ে তার প্রতিফলনই প্রকৃত সিরাতচর্চা।
জুমার মিম্বর থেকে
♦ গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম