রবিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতি

গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি: ১৫ জুলাই—ছাত্রীসহ শত শত আন্দোলনকারীর ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলা, প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সারাদেশ

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই, এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগ। নারী শিক্ষার্থীসহ শত শত আন্দোলনকারীর ওপর ন্যক্কারজনক এই হামলার প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সারাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা এমনকি স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝেও। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সমন্বিত হামলা চালায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেখানে হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগ কর্মী ও নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। আহতদের বেশিরভাগই ছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীরাও ছিলেন। পাশাপাশি কয়েকজন হামলা করতে আসা ছাত্রলীগ কর্মীও আহত হন।

চব্বিশের ১৫ জুলাই সকাল থেকেই উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরূপ মন্তব্যের প্রতিবাদে রাজু ভাস্কর্যের সামনে শুরু হয় তুমুল বিক্ষোভ। একপর্যায়ে লাঠি, লোহার রডসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে শত শত ছাত্রলীগ কর্মী জড়ো হয়। তাদের অনেককে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের এলাকা থেকে আনা হয়েছিল। পরে ক্যাম্পাসজুড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। যাদের সামনে পেয়েছে, তাদেরই মারধর করা হয়। নারী শিক্ষার্থীরাও হামলা থেকে রেহাই পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রকাশ্যেই নারী শিক্ষার্থীদের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। আহত অনেক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত অবস্থায় আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যান। সংঘর্ষের কারণে রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ইটের টুকরো।

একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরাও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুপুরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল এগোতে থাকে বিভিন্ন হলের দিকে। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে তাদের মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। বেধড়ক পেটানো হয় ছাত্রীদের। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ। সন্ধ্যার পর ঢাকা মেডিকেল, একুশে হল ও দোয়েল চত্বর এলাকায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীকে পাল্টা ধাওয়া দেন। তবে সহিংসতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

সন্ধ্যার পর একদল ছাত্রলীগ কর্মী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে ঢুকে পড়ে, যেখানে আহত আন্দোলনকারীরা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হয়।

এদিন কমপ্লিট শাটডাউনের মধ্যে রাজপথে নামে জুলাইয়ের অকুতোভয় সৈনিকরা। তাদের দমাতে পুলিশের সঙ্গে যুক্ত হয় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ঢামেকে ২৯৭ জন এবং সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে আরও ছয়জন চিকিৎসা নেন।

আন্দোলনকারীরা বলেন, সঠিক সংখ্যা তারা জানেন না। তবে তাদের ধারণা, দুই শতাধিক সহযোদ্ধা আহত হয়েছেন এবং অনেকের অবস্থা গুরুতর।

রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইডেন মহিলা কলেজে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করে।

এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ স্লোগান প্রসঙ্গে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। একই দিন এক সরকারি অনুষ্ঠানে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আন্দোলনকারীদের স্লোগান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তারা জানে না পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনী কীভাবে মানুষকে নির্যাতন করেছে। তাই নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জা লাগে না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মিছিল শুরু করেন। এর কিছুক্ষণ পর, রাত ৭টার দিকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। তাদের মধ্যে ২০ জনের অবস্থা খারাপ হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

রাতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। মধ্যরাতে ছাত্রলীগ কর্মীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ইটের টুকরো ছোড়ে। নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন শিক্ষার্থী দেয়াল টপকে উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং অন্যদের প্রবেশের জন্য গেট খুলে দেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রামে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রলীগ কর্মীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এর আগে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের চাবি নিয়ে যায় এবং ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। ছাত্রনেতা তালাত মাহমুদকে মারধর করে জোরপূর্বক প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আন্দোলনে অংশ নেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম। তখন ছাত্রলীগ কর্মীরা অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়।’

ইডেন মহিলা কলেজ

ইডেন মহিলা কলেজে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চারজন নারী শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ কর্মীরা মারধর করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আহত হন। আহত এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তারা আমাদের মারধর শুরু করে এবং হল থেকে বের না হতে হুমকি দেয়। কোনোভাবে আমি পালিয়ে বাঁচি।’

ক্যাটাগরি