সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয়

দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আখিরাতের উদ্দেশ্য

আল্লাহ তাআলা এই বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তু অত্যন্ত সুন্দর ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। উদ্ভিদের সৌন্দর্য তার সবুজ পাতা ও রঙিন ফুলে, আর উদ্দেশ্য শস্য ও ফল উৎপাদন।

কাপড়ের সৌন্দর্য তার রং ও নকশায়, আর উদ্দেশ্য মানুষের শরীর আবৃত ও সংরক্ষণ করা। তদ্রুপ পৃথিবীর সব সৌন্দর্য মানুষের চোখ ও মনকে আকর্ষণ করলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করা এবং আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুত করা।

দুনিয়ার এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে আছে এক মহান লক্ষ্য—ঈমান ও সৎ আমল। মানুষ যখন এ লক্ষ্য ভুলে যায়, তখন সে দুনিয়ার মোহে বন্দি হয়ে পড়ে।

সে স্রষ্টাকে ভুলে সৃষ্টি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় এবং ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসকেই জীবনের মূল উদ্দেশ্য মনে করে। অথচ নবী-রাসুলরা ও তাঁদের অনুসারীরা দুনিয়ার চাকচিক্যে নয়; বরং ঈমান, আমল, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দ্বিনের প্রচার-প্রসারে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন।

বর্তমান যুগে মানুষ দুনিয়ার সৌন্দর্য, খেল-তামাশা ও বিলাসিতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। কিন্তু ইসলাম আমাদের দুনিয়া বর্জনের শিক্ষা দেয় না; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে শিক্ষা দেয়। তাই প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি বিষয় গ্রহণের পাশাপাশি সাধ্যানুযায়ী সৎ আমল করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

ইবাদতের অর্থ শুধু নামাজ, রোজা বা হজ নয়; বরং দ্বিন পালনে সহায়ক প্রতিটি বৈধ কাজও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। জীবনের সৌন্দর্য, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা ভালোবাসা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে একজন মুমিন নিজের প্রবৃত্তির চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেবে। দুনিয়াবি প্রয়োজনের ওপর দ্বিনি প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো।

তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো। আর জমিনে ফ্যাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আল-কাসাস, আয়াত : ৭৭)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরে বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখ যে দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, পারস্পরিক গর্ব এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র আর দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা : আল-হাদিদ, আয়াত : ২০)

এরপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, তা তার জন্য শোভা করেছি, যাতে আমি পরীক্ষা করি—কর্মে তাদের মধ্যে কে উত্তম।’ (সুরা : আল-কাহাফ, আয়াত : ৭)

অতএব, দুনিয়ার সৌন্দর্য মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নয়; বরং পরীক্ষা করার জন্য। সফল সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াকে আখিরাতের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানায়। আর ব্যর্থ সেই ব্যক্তি, যে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে পড়ে চিরস্থায়ী আখিরাতকে ভুলে যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়ার মোহ থেকে হেফাজত করে ঈমান ও সৎ আমলের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রভাষক (আরবি)

মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

ক্যাটাগরি