শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

কর্ণফুলী নদী ঘিরে চোরাই জ্বালানি তেলের ভয়ংকর সিন্ডিকেট, নেপথ্যে ‘তেল শুক্কুর’ অভিযোগ

চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি | দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার যখন কঠোর নজরদারি ও রিজার্ভ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক সেই সময় কর্ণফুলী নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চোরাই জ্বালানি তেল সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং এর অধীনস্থ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও কর্ণফুলী এলাকায় কার্যত সেই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর-এ আগত দেশি-বিদেশি জাহাজ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি কৌশলে সংগ্রহ করে স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, জাহাজে বহন করা অতিরিক্ত তেল কম দামে গোপনে বিক্রি করা হয়। কোনো শুল্ক বা সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব তেল দেশে প্রবেশ করায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে কম দামে বাজারজাত হওয়ায় বৈধ জ্বালানি বাজারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আব্দুর শুক্কুর ওরফে ‘তেল শুক্কুর’। স্থানীয়দের দাবি, একসময় সাধারণ শ্রমিক থাকলেও বর্তমানে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে তার বিলাসবহুল বাড়ি ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়, যেখানে অন্তত ১৭ জন চিহ্নিত অপরাধী রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তেল চোরাচালান, চাঁদাবাজি, হামলা ও নির্যাতনের একাধিক মামলা রয়েছে। তবুও তারা দীর্ঘদিন ধরেই আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, জিডি ও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবুও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, এই সিন্ডিকেট রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির বৈধ ঠিকাদারদেরও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে বাধা দেয়। জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের লোকবল দিয়ে তেল খালাস ও পরিবহন সম্পন্ন করা হয়। পতেঙ্গা এলাকার ডিপো থেকে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক কার্যত একটি সমান্তরাল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লিটার তেল হাতবদল হচ্ছে। জাহাজ থেকে প্রতি লিটার ৫০–৫৫ টাকায় সংগ্রহ করে তা পাইকারদের কাছে ৬০–৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এতে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব ক্ষতি ও বাজার ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

এদিকে, এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে এই চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

ক্যাটাগরি