শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

বরিশাল–৫ : উদারতা নয়, কৌশল—জামায়াতের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বনাম চরমোনাইপন্থীদের আবেগী বিভ্রান্তি

ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমিরের আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এই ঘোষণার পর থেকেই একটি নির্দিষ্ট মহল ব্যাপক ব্যাখ্যা, উল্লাস ও বিদ্বেষমূলক প্রচারে নেমেছে। কেউ এটাকে জামায়াতের উদারতা বলছে, কেউ আবার রাজনৈতিক সৌজন্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর, আরও সুদূরপ্রসারী।

জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যারা চাইলেই নিজেদের লোক বসাতে পারে, কিন্তু বসায় না—কারণ তারা ব্যক্তি নয়, সিদ্ধান্তকে বড় করে দেখে। নিজেদের যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও দলীয় সিদ্ধান্তে ছাড় দেওয়ার এই মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। এখানেই জামায়াত ইউনিক। এখানেই তাদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ‘চেইন অফ কমান্ড’ অন্য সব বড় রাজনৈতিক দল থেকে আলাদা।

বরিশাল–৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কোনো আবেগী ছাড় নয়, বরং এটি একটি পরিণত, হিসেবি ও বহুস্তরবিশিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল। জামায়াত এখানে প্রমাণ করেছে—সব আসনে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক শক্তি নয়; বরং কোথায় দাঁড়াবে, কোথায় সরে আসবে এবং কখন কোন বার্তা দেবে—সেটাই প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে চরমোনাইপন্থীদের একাংশ যে ভাষা ও ভঙ্গিতে জামায়াতকে আক্রমণ করছে, তা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বলই করছে। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—“যদি এটি উদারতা হয়, তবে আগে কেন দেখানো হয়নি?” এই প্রশ্নই প্রমাণ করে, তারা রাজনীতিকে এখনো আবেগ ও আত্মতৃপ্তির চোখে দেখছে; কৌশল হিসেবে নয়।

বাস্তবতা হলো—বরিশাল–৫ আসনটি একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের জায়গা। এখানে জামায়াত সংখ্যার রাজনীতিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, ন্যারেটিভ কন্ট্রোল এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রার্থী প্রত্যাহার করে জামায়াত কাউকে শক্তিশালী করে দেয়নি; বরং নিজেকে এমন এক অবস্থানে স্থাপন করেছে, যেখান থেকে ফলাফল যেদিকেই যাক—নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় অর্থেই তারা সুবিধাজনক জায়গায় থাকে।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ফলাফল যেভাবেই আসুক—
বিএনপি জিতলে পুরোনো সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে,
চরমোনাই জিতলে ছাড় দেওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাবে,
আর চরমোনাই হারলে—“আমাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল”—এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার পূর্ণ সুযোগ থাকবে।

অর্থাৎ, যাই হোক না কেন—জামায়াত কৌশলগতভাবে লাভবান।
লোকজ ভাষায় বললে—শখের করাত, যাইতেও কাটে, আইতেও কাটে।

তবুও বিস্ময়ের বিষয়, এই সুস্পষ্ট রাজনৈতিক গেম প্লে দেখেও কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী জামায়াতকে হালকাভাবে নিতে চান। জামায়াতকে বুঝতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘ গবেষণালব্ধ রাজনৈতিক উপলব্ধি। নিজের সীমাবদ্ধতা দিয়ে জামায়াতকে বিচার না করাই শ্রেয়।

৫ই আগস্টের পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য দল পরস্পরের প্রতি একধরনের সহনশীলতা দেখিয়েছে। মতভেদ আছে, বাকযুদ্ধ আছে—কিন্তু প্রতিহিংসা নেই। এই সহনশীলতাই আগামী কয়েক বছর বিভিন্ন ইস্যুতে পারস্পরিক সহাবস্থান ও কৌশলগত সমঝোতার পথ তৈরি করবে।
দুঃখজনকভাবে, আওয়ামী লীগ কখনোই এই রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। যদি পারত, তবে হাজার হাজার মানুষের জীবন অকালে ঝরত না। বিভাজন ও দমননীতির রাজনীতি দেশকে ঐক্যহীন করেছে, সংহতিকে দুর্বল করেছে।

আজ জামায়াত এককভাবে সব নিতে চায় না। বরং সবাইকে ছাড় দিচ্ছে—এমনকি বিএনপিকেও। এটি নিছক রাজনীতি নয়, এটি মেটা-পলিটিক্স—রাজনীতির উপর রাজনীতি। জামায়াতের এই নতুন বাস্তবতাভিত্তিক ডক্ট্রিন বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোতে তাদের আবারও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে, ইসলামের বেসিক স্পিরিট অক্ষুণ্ণ রেখেই।

অন্যদিকে, চরমোনাইপন্থীদের আবেগী উল্লাস, জামায়াতবিরোধী বিদ্বেষ এবং আত্মপ্রবঞ্চনামূলক বয়ান ক্রমেই তাদের রাজনৈতিক হীনমন্যতাকে উন্মোচন করছে—যা শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই ক্ষতির পথে ঠেলে দিচ্ছে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—একটি ফ্রি, ফেয়ার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাহলেই স্পষ্ট হবে, কার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা গভীর, কার কৌশল টেকসই।

নতুন বাস্তবতার আভাস মিলছে। সময়ই সব উত্তর দেবে।

ক্যাটাগরি