শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক্সক্লুসিভ

মুরিদনির্ভর রাজনীতি ও জোটের বিপর্যয়: ইসলামপন্থী ধারার কঠিন বাস্তবতা

ইনসাফ নয় বিভ্রান্তির রাজনীতি: চরমোনাই, ভুল জোট ও ইসলামপন্থী সংকট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় খানকাহনির্ভর দল ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে অনুসারী বা মুরিদনির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দলটি রাজনৈতিক শালীনতা ও সহনশীলতার বদলে উগ্রতা ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবকে লালন করেছে। বাস্তবতা হলো—চরমোনাই যদি কারো মিত্র হয়, তবে তার আর শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না।

সমঝোতাভিত্তিক ইসলামপন্থী দলগুলোর সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য জরিপ অনুযায়ী সম্মিলিত ভোটশক্তি প্রায় ৪৬ শতাংশ। এর মধ্যে এককভাবে জামায়াতে ইসলামীর অংশ প্রায় ৩৩.৬ শতাংশ, আর অন্যান্য শরিক দলগুলোর সম্মিলিত অংশ ১২.৪ শতাংশ। এই ভোটের ভিত্তিতে যদি ৩০০ আসনের সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হতো, তবে জামায়াতের ন্যায্য প্রাপ্য আসন দাঁড়াতো প্রায় ২১৯টি, এবং অন্যান্য শরিক দলগুলোর প্রায় ৮১টি। এটিই হতো ন্যূনতম ন্যায্যতা—অর্থাৎ ‘ইনসাফ’।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে জামায়াত এই ইনসাফের সীমায় আটকে থাকেনি। জোটগত ঐক্য ও সমঝোতার স্বার্থে তারা নিজেদের প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিচারে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ত্যাগ—যা ‘ইনসাফ’-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘ইহসান’ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এই ধরনের আসন সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) ব্যবস্থার একটি বাস্তব ভিত্তিও তৈরি হতো, যা ১১ দলীয় আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল।

তবুও এই মহৎ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিলই থেকে গেছে। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা যায়—চরমোনাই দল জোটে না থাকলেও প্রায় সব আসনে বিকল্প জোট প্রার্থী বিদ্যমান; চরমোনাই ও এবি পার্টি উভয়ই না থাকলে কেবল বরিশাল-৩ আসনে শূন্যতা তৈরি হয়; আর চরমোনাই, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ—এই তিন দলই জোটের বাইরে থাকলে মোট ৭টি আসনে জোট প্রার্থী থাকত না। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, জোটের ভারসাম্য রক্ষায় সবচেয়ে বড় ছাড় ও ত্যাগ এসেছে জামায়াতের দিক থেকেই।

চরমোনাই ঘরানার রাজনীতি কেবল একটি জোটগত ব্যর্থতার নাম নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি আদর্শিক বিভ্রান্তি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এই গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বহু বরেণ্য আলেমকে অপমান করতে দ্বিধা করেনি। এমনকি জাতীয় মসজিদের পবিত্র মেহরাবও রাজনৈতিক সংঘর্ষের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কওমি ধারার শীর্ষস্থানীয় বহু আলেম চরমোনাই ঘরানার রাজনীতিকে ভণ্ডামি ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, পীরকেন্দ্রিক অন্ধ আনুগত্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সার এই মিশ্রণ ইসলামের প্রকৃত দাওয়াত ও উম্মাহর ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর।

এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে চরমোনাইকে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে উপস্থাপন করা আদর্শিক বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়। শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার বদলে লেখাপড়া-বিমুখ ও পীরনির্ভর রাজনীতি ইসলামপন্থী রাজনীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এমন একটি দলের সঙ্গে জোট গঠনে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখানো জামায়াতে ইসলামীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় কৌশলগত ভুল ছিল। এর দায় শুধু একটি দল নয়—নির্বাচনের আগে ও পরে সমগ্র ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারাকেই বহন করতে হবে।

চরমোনাই রাজনীতির ব্যর্থতা নতুন নয়—এর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
১৯৯১ সালে ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়েও তারা একটি আসনও পায়নি।
১৯৯৬ সালে এককভাবে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও ফলাফল শূন্য।
২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়ে ২৩টি আসনে সুযোগ পেলেও সিট পায়নি একটিও।
২০০৮ সালে ১৬৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ভোট পেলেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব শূন্যই থেকে যায়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে জাতীয়ভাবে মাত্র ১.৫ শতাংশ ভোট অর্জন—এটাই বাস্তবতা।

এর অর্থ পরিষ্কার—চরমোনাই এককভাবে নির্বাচনে গেলে জনগণের ভোট পায় না, আসন তো দূরের কথা। জামায়াতের মতো শক্তিশালী জোটসঙ্গী থাকলে হয়তো কিছু আসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়—কিন্তু বাস্তব ভোটব্যাংক তাদের নেই।
ইসলামী ঐক্যজোটের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফের বর্ণিত ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের ঘটনাটি এই সত্যকে নগ্নভাবে তুলে ধরে। পঞ্চাশ হাজার মুরিদের দাবি থাকা সত্ত্বেও ভোট পড়ে মাত্র তিন হাজার। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—রাজনীতিতে মুরিদ দিয়ে জমায়েত হতে পারে, কিন্তু ভোটে জয় আসে না।

এই বিভ্রান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি কৌশলগত অসঙ্গতি। যে সকল আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি, সেখানে মনোনয়ন দাখিলের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় এখন আর নতুন করে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই আসনগুলোতে জামায়াত কী করবে? কাকে সমর্থন দেবে? নাকি নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবে? এই সিদ্ধান্তহীনতা শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত নয়; এটি ইসলামপন্থী ভোটব্যাংকের ভেতরেও গভীর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

এখন সময় এসেছে কঠিন হলেও সত্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ইসলামপন্থী রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে চরমোনাই ঘরানার বিভ্রান্তিকর রাজনীতি থেকে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে জোট ও কৌশল নতুন করে পুনর্বিন্যাস করা অপরিহার্য। অন্যথায় আদর্শ নয়, বিভ্রান্তিই রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে—যার মূল্য দিতে হবে পুরো ইসলামপন্থী ধারাকেই।

অতএব, চোখ ও কান খোলা রাখা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রয়োগ করা এবং যুক্তিসঙ্গত কৌশলের ওপর অটল থাকাই এখন একমাত্র পথ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—ক্ষমতা, হিংসা ও অতিলোভ যখন নীতিকে গ্রাস করে, তখন ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতি।
লেখক: মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন চৌধুরী

ক্যাটাগরি