বুধবার, ৪ঠা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৯শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন ঠিকানা—প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ফিরল চার গ্রামের পাহাড়ি শিশুদের শিক্ষার নতুন দুয়ার

হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
অতিবৃষ্টির ভয়াবহ ধসে থমকে গিয়েছিল দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিশুদের শিক্ষাজীবন। বিদ্যালয় ভবন ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হোস্টেল মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে পড়ে চার গ্রামের ৫০-৬০ জন শিশুর পড়াশোনা। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে নতুন ভবন ও আবাসিক হোস্টেল ফিরে পেয়েছে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের বুঝিখাল ম্রো প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে পাহাড়ি শিশুদের মধ্যে আবারও বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ফেরার স্বপ্ন জেগেছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে নবনির্মিত বিদ্যালয় ভবন ও হোস্টেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ। উদ্বোধন উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ ও খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ বলেন, পাহাড় কিংবা সমতল—দেশের প্রতিটি অঞ্চলই সরকারের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলেও শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে, যাতে এখানকার শিশুরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী মারমা, চাকমা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, গারো, খুমি ও খাসিয়াসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ একই দেশের নাগরিক। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই মিলে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

বুঝিখাল ম্রো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, আলীকদমের দুর্গম পাহাড়ে অতিবৃষ্টিতে বিদ্যালয়টি ধসে পড়ার খবর পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দ্রুত বিদ্যালয় ও হোস্টেল পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ থেকে ১৪ জুলাইয়ের টানা অতিবৃষ্টিতে বিদ্যালয় ভবন ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হোস্টেল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে চার গ্রামের শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি। নতুন স্থাপনায় বিদ্যালয় ও হোস্টেলের জন্য পৃথকভাবে তিনটি করে কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গর্ডেন ত্রিপুরা বলেন, নতুন করে বিদ্যালয় নির্মিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরে এসেছে। এ উদ্যোগের ফলে শিশুরা আবারও স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার সুযোগ পাবে। বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

স্থানীয় পাড়া কারবারি দমলয় মুরুং বলেন, আশপাশের চার গ্রামের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা এই বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি ধসে পড়ার পর শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নতুন করে বিদ্যালয় ও হোস্টেল নির্মিত হওয়ায় সেই উদ্বেগ অনেকটাই কেটেছে। এখন শিশুরা আবারও পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম জানান, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দ্রুততম সময়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নজরুল ইসলাম, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন, পিআইও কর্মকর্তা মো. এ কে এম নজরুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নুরুছাফাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন ভবনে পাঠদান শুরুর মধ্য দিয়ে দুর্গম পাহাড়ের শিশুদের শিক্ষাজীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত পাঠদান ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ি জনপদের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আরও বিস্তৃত হবে শিক্ষার সুযোগ।

ক্যাটাগরি