ফ্রান্সের পর জার্মানিতেও তরুণদের বিক্ষোভের আগুন
ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে চলমান গণআন্দোলনের ঢেউ এবার প্রতিবেশী দেশ জার্মানিতেও জোরালোভাবে আছড়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা অসঙ্গতির প্রতিবাদে জার্মানির রাজপথে নেমেছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ। একই দিনে ফ্রান্সেও নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক লাখ নাগরিক।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) জার্মানির বিভিন্ন প্রধান শহরে ‘জেন জেড হ্যাজ গট দিস!’ নামের একটি নতুন প্রজন্মের তরুণ প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
জার্মানিতে ‘জেন জেড হ্যাজ গট দিস!’ নামে নতুন একটি তরুণ আন্দোলনের ব্যানারে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ পুনরায় চালুর সম্ভাবনার প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামেন। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, কোলন ও মিউনিখসহ বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয়।
বার্লিনে বিক্ষোভ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোলন ও হামবুর্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোলনে বিক্ষোভ চলাকালে আতশবাজি ফোটানোর পর পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। হামবুর্গে ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং জরুরি সেবাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টে জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়া এবং দোকানের জানালা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরের জেইল শপিং স্ট্রিটের একটি অংশ বন্ধ করে দেয় পুলিশ। একটি অস্ত্রের দোকানের জানালা ভাঙার ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে আটক করে দুটি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
আয়োজকদের দাবি, শনিবার জার্মানিজুড়ে বিক্ষোভে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন। হ্যালোইন উৎসবের দিনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ও আন্দোলনের প্রচার বাড়ানোর লক্ষ্যে।
এদিকে ফ্রান্সে শনিবার ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের ব্যানারে দেশজুড়ে তৃতীয় দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৭ ও ২৪ অক্টোবরের পর এটি ছিল আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ৭০ হাজার।
আগের দুই দফায় যথাক্রমে ৫ লাখ ৫০ হাজার ও ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ২৯৬ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিক্ষোভ ঘিরে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে অতিরিক্ত ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ শহরের কেন্দ্রস্থলের বাইরে বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও বোর্দো, তুলুজ, রেন, লিল, নঁত, মার্সেই ও লিয়োঁসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রেনে পুলিশের ওপর হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান বিক্ষোভে অন্তত ১ হাজার ১৯৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফ্রান্সে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষকসংকট, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে তারা আন্দোলনে নামে। পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। সেদিন তিন হাজারের বেশি দোকানে হামলা ও লুটপাট হয় এবং ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন। পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একে ‘সম্মিলিত ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। এদিকে আগামী ৫ নভেম্বর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের জোট। ফলে ফ্রান্সে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন