শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্ন্তজাতিক

৬.৩ বিলিয়ন ক্রিপ্টো চুরি, সন্দেহে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে ঘটে গেছে ক্রিপ্টো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা। হ্যাকাররা মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন (৬৩০ কোটি) মার্কিন ডলারের ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নিয়েছে।
এই নজিরবিহীন সাইবার হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ তাদের সব অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
কীভাবে ঘটল এই বিশাল সাইবার হামলা?
ব্লকচেইনে সংরক্ষিত লেনদেনের তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সময় রাত ৮টার পর হামলাকারীরা এই অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে বড় অংশ সম্পন্ন করে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা: বাইন্যান্সের প্রাথমিক ধারণা ছিল একটি ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে, তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থার আরও কিছু গভীর দুর্বলতা ধরা পড়ে।
সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নিয়ন্ত্রণ: ব্লকচেইন বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস-এর তথ্য মতে, হ্যাকাররা বাইন্যান্সের লেনদেন অনুমোদনের কাজে ব্যবহৃত ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।

ভল্টের নিয়ন্ত্রণ কৌশল: ডিজিটাল অপরাধবিষয়ক আইনজীবী জশুয়া চু বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, হ্যাকাররা সরাসরি ভল্টের চাবি চুরি করেনি, বরং ভল্ট থেকে অর্থ বের করার নির্দেশ দেওয়ার পুরো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।

উত্তর কোরিয়াকে সন্দেহের মূল কারণ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রিপ্টো বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ‘টিআরএম ল্যাবস’ এবং ‘চেইন্যালাইসিস’ দাবি করেছে, এই সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেটর’ (যা ‘লাজারাস গ্রুপ’ নামেও পরিচিত) জড়িত।

এর পেছনে মূল তিনটি কারণ হলো–
হামলার ধরন ও কৌশলের মিল: এই সাইবার আক্রমণের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য ও কৌশল উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের পূর্ববর্তী সাইবার অভিযানগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
বাইবিট হামলার পুনরাবৃত্তি: ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল, বাইন্যান্সের ঘটনায় ব্যবহৃত কৌশলের সঙ্গে বাইবিটের সেই হামলার সুনির্দিষ্ট মিল রয়েছে।
অর্থ মেশানোর পরিচিত কৌশল: চেইন্যালাইসিস লক্ষ্য করেছে যে, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটজেট থেকে চুরি হওয়া সম্পদের সঙ্গে বাইন্যান্স থেকে লুট করা অর্থ মেশানো হচ্ছে– যা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের একটি পরিচিত অর্থ পাচার পদ্ধতি।
তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরের মতোই এ ধরনের হ্যাকিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, তদন্তে এখনো অপরাধীদের পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

লুট হওয়া অর্থের বর্তমান অবস্থা
অর্ধেক সম্পদ ফ্রিজ/জব্দ: চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেকই ছিল টেথার (USDT), সার্কেল (USDC), রিপল ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের মতো স্টেবলকয়েন। এসব মুদ্রার ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান দূর থেকেই ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা রাখায় সেগুলো দ্রুত আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বিটকয়েন ও ইথার এখনো জব্দের বাইরে: টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন ও ইথার বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় এবং কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ না থাকায় এখনো জব্দের বাইরে রয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার: হ্যাকাররা শনাক্তকরণ এড়াতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প সময়ে হাজার হাজার লেনদেন সম্পন্ন করে উৎস আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয় পদক্ষেপ
গ্রাহকদের শতভাগ ক্ষতিপূরণ: বাইন্যান্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা চাংপেং ঝাও এবং সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের সব তহবিল নিরাপদ রয়েছে। বাইন্যান্সের ১ বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন সংবলিত বিশেষ রিজার্ভ তহবিল (SAFU) এবং কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ থেকে গ্রাহকদের সব ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হবে।
তদন্ত ও লেনদেন স্থগিত রাখা: বাইন্যান্স আপাতত ডিপোজিট ও উইথড্রয়াল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ও গোয়েন্দাদের সঙ্গে চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে কাজ করছে।
ক্রিপ্টো বাজারে প্রতিক্রিয়া: ঘটনার পরপরই ক্রিপ্টো বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের দাম ৫ থেকে ৬ শতাংশ কমেছে এবং বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন ‘বিএনবি’র দরপতন ঘটেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স

ক্যাটাগরি