বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

শিক্ষার্থীদের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শিক্ষকদের আরও দক্ষ হতে হবে: মেয়র শাহাদাত

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) পরিচালিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম-২০২৬ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, বরং আনন্দময় ও কার্যকর পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষকের ক্লাস শিক্ষার্থীদের কাছে যত বেশি প্রাণবন্ত ও আনন্দময় হবে, তারা তত বেশি আগ্রহ নিয়ে পাঠ গ্রহণ করবে। প্রচলিত একঘেয়ে পাঠদানের পরিবর্তে গল্প, কৌতুক, গান, উদাহরণ ও বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব।

মেয়র বলেন, ‘একজন শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি শিশু ঘর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার পর তার দেখভালের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর বর্তায়।’

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ থাকলে, ক্লাসে অনাগ্রহ দেখালে কিংবা সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না চাইলে বিষয়টি শিক্ষকদের নজরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে তার সমস্যার কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের অভাবে তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হতে পারে না। এ কারণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।’

এ লক্ষ্যে চসিকের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মেয়র। প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে তার অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ, আচরণ ও নিয়মিত পড়াশোনার বিষয়েও শিক্ষকদের খোঁজ রাখতে হবে।

নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একসময় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রাখতেন। এমনকি শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে শিক্ষকরা বাড়িতেও গিয়ে খোঁজ নিতেন। শিক্ষকদের এমন আন্তরিকতা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মেয়র আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠ সহজে মনে রাখানোর জন্য শিক্ষকদের বিভিন্ন কার্যকর কৌশল ব্যবহার করতে হবে। কঠিন বিষয়কে সহজ সূত্র, উদাহরণ কিংবা স্মরণযোগ্য পদ্ধতির মাধ্যমে উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে তা শিখতে পারে।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক নিজেও একজন আজীবন শিক্ষার্থী। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা একজন শিক্ষককে আরও সমৃদ্ধ করে।’

চসিকের শিক্ষা কার্যক্রম প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সিটি কর্পোরেশন বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যেই।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় খেলার মাঠ উন্নয়ন এবং নতুন মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাদক, কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

চসিকের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপরও গুরুত্ব দেন মেয়র। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. কিসিন্জার চাকমা। এ সময় চসিকের শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং প্রশিক্ষণার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে মোট ৬০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি চসিক পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকদেরও এ কার্যক্রমের আওতায় দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উদ্বোধনী বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন শিক্ষকদের সমাজের ‘দর্পণ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষকরাই একটি প্রজন্মকে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ক্যাটাগরি