মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

পাহাড়ি মানুষের তৃষ্ণা বেচে কোটি টাকা লোপাট: বান্দরবানে ৪৫ কোটির পানি প্রকল্পে জালিয়াতির ‘পাহাড়’

হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
বান্দরবানের পাহাড়ে একফোটা নিরাপদ পানির জন্য যখন দুর্গম এলাকার মানুষের হাহাকার নিত্যদিনের চিত্র, তখন সেই মানবিক সংকটকে পুঁজি করেই চলছিল কোটি কোটি টাকারলুটপাট। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে নেওয়া ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে কাজ না করেই ভুয়া বিল তুলে নেওয়ার নজিরবিহীন দুর্নীতি উন্মোচন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট নামমাত্র ও অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।

​দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবদুল আল নোমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দিনভর অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র জব্দ করার পর তদন্ত দলটি কুহালং ইউনিয়নের বাকীছড়া পাড়াসহ একাধিক এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান।

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। নথিপত্রে কাজ দেখানোর জন্য একটি মাত্র নলকূপের ছবি বারবার ব্যবহার করে একাধিক এলাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী সঠিক মান বজায় না রেখে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের পাইপ, পাম্প ও যন্ত্রাংশ, যা চালুর আগেই অকেজো হওয়ার উপক্রম। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন মেয়াদী এই প্রকল্পে বান্দরবানে নিরাপদ পানির কাভারেজ ৬৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে পরিবর্ধিত ১৩ শতাংশের বিপরীতে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। ফলে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকাই চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে।

​স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এই বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের আওতায় ১০টি নলকূপ, ৮৫টি গভীর নলকূপ, ৩০টি পাবলিক টয়লেট, ৮৫টি পাম্প হাউস, ৮৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, ১২টি জিএফএস সংস্কার, ১৪০টি রিংওয়েল এবং রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ কাজ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকায় সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন স্থানীয়রা।

​অভিযান শেষে দুদকের কক্সবাজার কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে প্রতিবেদন ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। অভিযানকালে কার্যালয়ে প্রাক্কলনবিদ মোহাম্মদ জুলহাস ও নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে উপস্থিত থাকলেও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলে তিনি আর ফোন ধরেননি।

ক্যাটাগরি