আয়ুষ্কাল শেষের পথে, নেই সংস্কার: ৪০ সেতু রূপ নিয়েছে ‘ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যু ফাঁদে’
হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:
বান্দরবানের সাতটি উপজেলার সড়ক যোগাযোগে ব্যবহৃত ৯৩টি বেইলি ব্রিজের মধ্যে ৪০টিই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাব এবং আয়ুষ্কালের শেষপ্রান্তে এসে জরাজীর্ণ এসব সেতু দিয়ে প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করছে পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস ও পর্যটকবাহী হাজারো যানবাহন। স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহন চালকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পাহাড়ি এই জেলার অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে।
জেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা মিলিয়ে মোট বেইলি ব্রিজে রয়েছে ৯৩টি যার মধ্যে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে ৪০টি। ১৯৮২-৮৩ অর্থ বছরে নির্মিত সেতুগুলোর বর্তমান বয়স প্রায় ৪৩ বছর। ঝুঁকিপূর্ণ সেতু গুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে প্রায় প্রত্যেকটাই অসম্ভব পিচ্ছিল ও ফুটো পাটাতনে ভরা। যেকোন যানবাহন চলাচলে অতিরিক্ত কম্পন সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক শিলক খালের সেতু ভেঙে টানা ১৩ দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো।
বান্দরবান-রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ বেইলি ব্রিজের স্টিলের পাটাতন ক্ষয়ে গেছে, অনেক স্থানে বড় বড় ফুটো তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের একদিকে গভীর খাদ ও অন্যপাশে খাড়া পাহাড়ের মাঝের এসব সেতুতে বৃষ্টি হলেই পানি জমে কাদা তৈরি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন মোটরসাইকেল আরোহী পর্যটক ও পথচারীরা।
পর্যটকদের অভিযোগ, রুমা থেকে ওয়াই জংশন আসতেই ১৫-২০টি নিচু ও পিচ্ছিল বেইলি সেতু পার হতে হয়, যেখানে বাইকের চাকা স্লিপ কেটে দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতি ও রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা জানান, সেতুগুলো দ্রুত আরসিসি (RCC) ঢালাই সেতুতে রূপান্তর করা না হলে বর্ষা মৌসুমে পর্যটন খাতসহ স্থানীয় অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় সেনাসদস্যদের রসদ ও সরঞ্জাম দ্রুত পারাপারের লক্ষ্যে ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে এসব পোর্টেবল ও প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল। সাধারণত এসব সেতুর স্থায়িত্ব ৪৫ থেকে ৫০ বছর ধরা হলেও নিয়মিত মেরামতের শর্ত থাকে। তবে ৪৩ বছর ধরে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন ভারী যানবাহন সেতুতে উঠলেই পুরো কাঠামো কাঁপতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতুতে দুর্ঘটনার নজিরও কম নয়।
সম্প্রতি গত ১০ জুলাই বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের শিলক খালের ওপর ৯৩ মিটার দীর্ঘ বেইলি ব্রিজের প্রায় ৩০ মিটার অংশ হঠাৎ ভেঙে নদীতে তলিয়ে যায়। এতে কোনো প্রাণহানি না হলেও টানা ১৩ দিন রাঙামাটির সাথে বান্দরবানের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এর আগে ২০২২ সালেও বান্দরবান-রুমা-চিম্বুক সড়কে অতিরিক্ত মালবাহী ট্রাকের ধাক্কায় সেতু ভেঙে ৮ জন গুরুতর আহত হন।
সেতুগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা স্বীকার করে বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখায়াত হোসেন জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রথম ধাপে ২০টি জরাজীর্ণ বেইলি ব্রিজ ভেঙে স্থায়ী আরসিসি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া বাকি সেতুগুলোর জন্য চট্টগ্রাম জোনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থায়ী স্বস্তি ফিরবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।