রাসুল (সা.)-এর শ্রমনীতি অনুসরণেই শ্রমিকের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে: মুহাম্মদ শাহজাহান
রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ ও শিল্প মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান।
তিনি গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর উদ্যোগে ‘রাসুল (সা.) এর শ্রমনীতি ও আধুনিক যুগে এর প্রাসঙ্গিকতা ‘শীর্ষক সীরাত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ. ক. ম আবদুল কাদের। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও নগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও প্রধান আলোচক ছিলেন আইআইইউসির কুরআনিক সাইন্স এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড.বিএম মফিজুর রহমান আজহারী।
মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শ্রমিকদের শুধু শ্রমিক হিসেবে দেখেননি, বরং ‘ভাই’ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন। অথচ বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকদের কাছ থেকে শ্রম আদায় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না। রাসুল (সা.)-এর জীবন ও শ্রমনীতি অনুসরণ করলে শ্রমিকের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু শ্রমিকদের সংগঠিত করাই যথেষ্ট নয়; শিল্প মালিক ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। মালিক শ্রেণির চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এলে তাদের অধীনস্থ শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। সমাজ পরিবর্তন ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেককে নিজ নিজ জ্ঞান, দক্ষতা ও শ্রম দিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রবন্ধকার অধ্যাপক ড. আ. ক. ম. আবদুল কাদের বর্তমান বিশ্বে রাসূল (সা.)-এর শ্রমনীতির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান বিশ্বে শ্রম আইন মূলত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোকে পরিচালিত হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রমনীতির ভিত্তি হলো কুরআন ও হাদিস। ইসলামের শ্রমনীতি শ্রমিককে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা না করে তার মানবিক মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, সময়মতো পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক অধিকার নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেয়। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধের নির্দেশনা এবং শ্রমিকের প্রতি সদয় ও ন্যায়সংগত আচরণের শিক্ষা বর্তমান শ্রমবাজারেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত মজুরি, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবসহ শ্রমিকদের নানা সমস্যা সমাধানে রাসূল (সা.)-এর শ্রমনীতির মূলনীতি বাস্তবায়ন করা হলে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে।
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সীতাকুণ্ডের বন্ধ টেক্সটাইল মিলের ১ হাজার ৭৩ জন শ্রমিক-কর্মচারীর বকেয়া ২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অব্যবহৃত জমি দেশের নিরাপত্তায় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিলেও শ্রমিকদের পাওনা আটকে রাখা সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, ইসলামী শ্রমনীতিতে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও জবাবদিহিতার অনুভূতি জরুরি। বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় কর্মক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান আলোচক ড. বিএম মফিজুর রহমান আজহারী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রমনীতি শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের; তাই শ্রমিককে সম্মান করা, তার সামর্থ্যের বাইরে কাজের বোঝা না চাপানো এবং অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা দায়িত্বের অংশ।
তিনি বলেন, পৃথিবীর সব উন্নয়নের পেছনে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও তারাই সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তে রাসুল (সা.)-এর শ্রমনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব। ইসলামে শ্রমকে ঈমান ও ইবাদতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে; সৎভাবে পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জনকে মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইসলামের কল্যাণমুখী শ্রমনীতি মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে, যাতে শ্রমজীবী মানুষ তাদের প্রকৃত অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।
ফেডারেশনের নগর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে আরও আলোচনায় অংশ নেন নগর জামায়াতের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, ফয়সাল মোহাম্মদ ইউনুছ, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মুহাম্মদ ইসহাক, নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মেয়র প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী, ফেডারেশনের মহানগরীর সহ-সভাপতি নজির হোসেন ও সহসাধারণ সম্পাদক এম আসাদ উল্লাহ আদিল।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন কোতোয়ালী থানা জামায়াতের সেক্রেটারী মোস্তাক আহমেদ, বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মজুমদার, ফেডারেশনের মহানগর সহ-সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শিহাব উল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদুল ইসলাম,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ আলী, কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুন্নবী, দপ্তর সম্পাদক স ম শামীম, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম,পাঠাগার সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম ও
প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহীম মানিক প্রমুখ।