পাহাড়খেকো সিন্ডিকেটের পেটে আলীকদম ও লামার রিজার্ভ ফরেস্ট, নেপথ্যে বনবিভাগের ‘অন্ধ’ ভূমিকা
হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:
পার্বত্য বান্দরবানের আলীকদম ও লামা—দুই উপজেলা জুড়েই সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেস্ট) গিলে খাচ্ছে এক শক্তিশালী ভূ-দখলদার সিন্ডিকেট। কাগজে-কলমে যা সরকারি বনভূমি, বাস্তবে তার শত শত একর জমি এখন স্থানীয় প্রভাবশালী, ভুয়া ‘সুবিধাভোগী’ ও পাহাড় খেকোদের পেটে। বন সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা বনবিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে অশুভ আঁতাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বেপরোয়া দখলদারিত্বের কারণে পুরো অঞ্চলে নেমে এসেছে চরম পরিবেশ বিপর্যয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দুই উপজেলায় দখলদারিত্বের এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা। বনের জমি গ্রাস করতে সিন্ডিকেটটি প্রথমে ব্যবহার করে জুম চাষ, ফলজ বাগান বা সামাজিক বনায়নের অজুহাত। এরপর শুরু হয় মূল ধ্বংসযজ্ঞ—রাতের আঁধারে রাসায়নিক ছিটিয়ে ও গোড়া কেটে মেরে ফেলা হয় শতাব্দীর প্রাচীন সব মহামূল্যবান গাছ, কেটে সমতল করা হয় সুবিশাল পাহাড়। পরবর্তীতে বেহাত হওয়া এসব ভূমিতে গড়ে তোলা হয় তামাকের শত শত অবৈধ চুল্লি, বাণিজ্যিক খামার ও আলিশান রিসোর্ট। এমনকি প্রশাসনিক নজর এড়াতে ভুয়া স্ট্যাম্প ও জাল কাগজের মাধ্যমে রিজার্ভের জমি বেচাকেনার এক বিশাল কালো বাজার গড়ে উঠেছে লামা ও আলীকদমে।
আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ও দখল শতভাগ দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও, এই দুই উপজেলায় বনবিভাগের ভূমিকা চরম বিতর্কিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বন ধ্বংসের এই উৎসব দেখেও ‘অন্ধ’ সেজে থাকেন। লোকদেখানো দু-একটি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও নেপথ্যের মূল অর্থ জোগানদাতা ও প্রভাবশালী মাস্টারমাইন্ডরা থেকে যান অধরা।
প্রকৃতির ওপর এই অবিরাম তাণ্ডবে আলীকদম ও লামার ভূ-প্রকৃতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অবাধে পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করায় দুই উপজেলার প্রধান পানির উৎস প্রাকৃতিক ঝিরি-ছড়াগুলো শুকিয়ে গেছে, দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট। একই সাথে বনের বুক চিরে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করায় আসন্ন বর্ষায় দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ পাহাড় ধসের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের জোর দাবি, আলীকদম ও লামার সংরক্ষিত বনাঞ্চল বাঁচাতে অবিলম্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে বনের প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালানো এবং অপরাধী চক্রসহ আঁতাতকারী বন কর্মকর্তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।