লামায় শতাধিক পয়েন্টে অবৈধ বালু উত্তোলন, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নজরুল ইসলাম, লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধিঃ
বান্দরবানের লামা উপজেলায় বৈধ ইজারা ছাড়াই বিভিন্ন নদী, খাল, ছড়া ও ঝিরি থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার সরই, ফাঁসিয়াখালী, লামা সদর ও আজিজনগর ইউনিয়ন এবং লামা পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্থানে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহল ও বালু ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চলে আসছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু সরই ইউনিয়নে প্রায় ৪০টি এবং ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে প্রায় ৩০টি বালু উত্তোলন পয়েন্ট রয়েছে। এর বাইরে লামা সদর ইউনিয়ন, আজিজনগর ইউনিয়ন ও লামা পৌরসভার আশপাশের এলাকাতেও বিভিন্ন পয়েন্টে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সব মিলিয়ে উপজেলায় শতাধিক পয়েন্টে বালু উত্তোলন চলছে।
মাতামুহুরি নদী, পানির ছড়া, পেতইন্যার ছড়া, বমু খাল, রেজু খাল, ফুইট্যা ঝিরিসহ অসংখ্য নদী, খাল, ছড়া ও ঝিরি থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে। উত্তোলনের পর বালু সংশ্লিষ্ট পয়েন্টের পাশেই স্তূপ করে রাখা হয়। পরে ডাম্প ট্রাক, মিনি ট্রাক, ট্রলি, ট্রাক্টর, হিনো ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে এসব বালু বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের তথ্য ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পয়েন্ট মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি যানবাহনে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে একদিকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন হচ্ছে, অন্যদিকে নদী-খাল ও ছড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৈধ ইজারা না থাকার পরও উত্তোলন
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে এসব বালু উত্তোলন পয়েন্টের কোনো বৈধ ইজারা নেই। এরপরও কোথাও কোথাও পুরোনো একটি ইজারা কাগজ দেখিয়ে বালু উত্তোলনের বৈধতা দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই কাগজটি বর্তমান বালু উত্তোলনের বৈধ অনুমোদন নয় এবং এর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সরকারি নথি যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, বৈধ ইজারা না থাকলে কোন ক্ষমতাবলে নদী-খাল-ছড়া থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও পরিবহন হচ্ছে, সেটি তদন্ত করা জরুরি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বদলায়নি বালু উত্তোলন
সরই ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বালু উত্তোলন করেছিল। পটপরিবর্তনের পর বিএনপির নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে বালু উত্তোলন হচ্ছে।”
তবে ওই স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলেও উত্তোলন বন্ধ হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বালু উত্তোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং এর পেছনে কারা সক্রিয়?
অভিযান হচ্ছে, তবুও বন্ধ হচ্ছে না
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ফাঁসিয়াখালীর পেতইন্যার ছড়ায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও শ্যালো মেশিন জব্দ করা হয়েছে। লামা পৌরসভার মাতামুহুরি নদী থেকেও শ্যালো মেশিন জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া এক বালু ব্যবসায়ীকে মোবাইল কোর্টে দুইবার কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় আবারও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযান ও শাস্তির পরও কীভাবে একই ব্যবসা আবার শুরু হচ্ছে?
সীমান্তের সুযোগ নিচ্ছে উত্তোলনকারীরা—ইউএনও
অভিযোগের বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “বিভিন্ন অবৈধ বালু পয়েন্টে জরিমানা করা হয়েছে, শ্যালো মেশিন জব্দ করা হয়েছে, অভিযান অব্যাহত আছে।”
তিনি বলেন, লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালীর কিছু বালু উত্তোলন পয়েন্ট পার্শ্ববর্তী চকরিয়া উপজেলার সীমানার কাছাকাছি। প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলনকারীরা সংকেত পেয়ে চকরিয়া সীমানায় চলে যায়। ফলে ফাঁসিয়াখালীর প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইউএনও আরও বলেন, আজিজনগর ও সরই ইউনিয়নের কিছু এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। এসব এলাকার কিছু বালু উত্তোলন পয়েন্ট পার্শ্ববর্তী লোহাগাড়া উপজেলার সীমানার কাছাকাছি হওয়ায় উত্তোলনকারীরা প্রশাসনের অভিযানের সময় সীমানার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে।
পরিবেশ ও জনজীবনে ক্ষতির আশঙ্কা
স্থানীয়দের অভিযোগ, যত্রতত্র শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদী-খাল-ছড়া ও ঝিরির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। কোথাও নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া ভারী যানবাহনে বালু পরিবহনের কারণে স্থানীয় সড়কে বাড়ছে চাপ। বর্ষা মৌসুমে নদীর পাড় ও তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি এসব এলাকায় বৈধ ইজারা না থাকে, তাহলে দিনের পর দিন এতগুলো পয়েন্টে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন কীভাবে চলছে? পয়েন্টের পাশেই বালু মজুদ এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী যানবাহনে নিয়মিত পরিবহন চললেও কারা এসব পয়েন্ট পরিচালনা করছে, তা শনাক্ত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের অভিযানকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই যদি বালু উত্তোলনকারীরা সংকেত পেয়ে যায়, তাহলে অভিযানের খবর তাদের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে—এ বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে।
সমন্বিত অভিযান চান এলাকাবাসী
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরিমানা বা শ্যালো মেশিন জব্দ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। লামা, চকরিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতিটি বালু উত্তোলন পয়েন্ট চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বন্ধ, মেশিনের মালিক ও বালু ব্যবসায়ীদের শনাক্ত এবং বালু মজুদ ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের আরও কঠোর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে লামার নদী, খাল, ছড়া ও ঝিরির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জনজীবনে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি হতে পারে।