বুধবার, ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

দুর্গম তিন্দুর ‘নৌকা চালানো’ সেই প্রধান শিক্ষকের হাতে উঠল রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
দুর্গম পাহাড়ের আঁকাবাঁকা সাঙ্গু নদী। মাঝপথে গর্জে উঠছে ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ, আর হাল ধরে আছেন এক ব্যক্তিসত্তা—উদ্দেশ্য কোনো নিজের পকেট ভারী করা নয়, বরং দুর্গম পাহাড়ের আলো ছড়ানো সহকর্মীদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানো। পাহাড়ের শিক্ষা আন্দোলনের এই অনন্য আলোকবর্তিকা, বান্দরবানের তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন অবশেষে পেলেন তাঁর চরম আত্মত্যাগের পরম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে গুণী এই শিক্ষকের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, ২ লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। সারা দেশের ১০২ জন সেরা শিক্ষকের মধ্য থেকে ‘বিশেষ ক্যাটাগরি’র অনন্য সাতজনের একজন হিসেবে এ স্বীকৃতি পান তিনি।

২০২০ সালে বান্দরবানের থানচির দুর্গম তিন্দু এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে সেখানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে পাহাড়ের প্রান্তিক ও চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা পরিবারগুলোর সন্তানদের পক্ষে নিয়মিত স্কুলের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা।

স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলে হাল ছাড়েননি প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। সহকর্মীদের সংসার সচল রাখতে ছুটির দিনে নিজেই নেমে পড়েন বিকল্প লড়াইয়ে। হাতে তুলে নেন ইঞ্জিনচালিত নৌকার হাল। থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে পর্যটক ও সাধারণ যাত্রী পরিবহন করে যা আয় হতো, তার সিংহভাগই তুলে দিতেন সহকর্মীদের হাতে। শুধু চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলেই নৌকা চালিয়ে অর্জিত ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন হিসেবে ভাগ করে দেন তিনি।

একজন শিক্ষকের এমন অভাবনীয় মানবিকতা ও ত্যাগের গল্প গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে তৈরি হয় প্রবল আলোড়ন। শিক্ষক সমাজের এই মহানুভবতা স্পর্শ করে সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও। এর প্রেক্ষিতে গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা আসে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে ‘তিন্দু সরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

সহকর্মীদের টিকিয়ে রাখতে এক শিক্ষকের ডিঙি নৌকা চালানোর গল্পটি আজ আর কেবল কোনো সংগ্রামের রূপকথা নয়; তা রূপ নিয়েছে একটি সরকারি বিদ্যাপীঠ এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননায়। পাহাড়ের বুকে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার আলো এখন আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে এই গুণী শিক্ষকের হাত ধরে।

ক্যাটাগরি