বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

সাংবাদিক সেলিমের ওপর সন্ত্রাসী হামলা: নেপথ্যে সেই ‘সিআইপি মুজিব’ ও তার অনুসারীরা

চট্টগ্রামে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে ‘দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম’-এর সহ-সম্পাদক ও সংবাদিক সেলিম উল্লাহর ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও বহাল তবিয়তে থাকা বিতর্কিত দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ‘সিআইপি মুজিব’ এবং তার অনুসারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখার জেরে এই হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে নগরীর কাজির দেউড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা ও ছিনতাই এর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে কোতোয়ালী থানায় এজাহার দায়েরের আবেদন করা হলেও পুলিশ এখনো মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

আওয়ামী দোসর মুজিবের বিতর্কিত প্রটোকল ও ক্ষমতার দাপট:
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদের অধিকাংশ সংসদ সদস্য আত্মগোপন বা পলায়ন করলেও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং বাঁশখালীর সাবেক এমপি সিআইপি মুজিব বহাল তবিয়তে রয়েছেন। প্রকাশ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের অর্থ জোগানদাতা এবং সাধারণ জনগণ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলার মাধ্যমে তিনি চন্দনপুরার দখলকৃত জমিতে বানানো বিলাসবহুল বাড়িতে দাপটের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে খোদ সরকার দলীয় এমপি/রাজনীতিকরা প্রটোকল থেকে দূরে আছেন, সেখানে আওয়ামী দোসর সিআইপি মুজিবের বাসার সামনে রাষ্ট্রায়ত্ত পুলিশ প্রশাসনের একটি টিম ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা প্রদান করে যাচ্ছে। ঘর থেকে বের হলেই তার বহরে থাকে অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ৮ থেকে ১০ জন যুবক। অথচ আওয়ামী দোসর প্রভাবশালী শিল্পপতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকলেও তার এই বিলাসী জীবনযাপন এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাতায়াত নিয়ে জনমনে ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সাংবাদিকের ওপর অতর্কিত হামলা:
প্রতিদিনের ন্যায় অফিস শেষ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ৯টার দিকে কাজির দেউড়ি এলাকার এস.এ পরিবহনের সামনে পৌঁছালে সিআইপি মুজিবের অনুসারী সন্ত্রাসীরা ওত পেতে থেকে সাংবাদিক সেলিম উল্লাহর পথ রোধ করে।
হামলার সময় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “সিআইপি মুজিবের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার সাহস কোথায় পেলি?” এরপর তাকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতর জখম করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। আশপাশের পথচারী ও সহকর্মীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় পকেটে থাকা পত্রিকা অফিসের দাপ্তরিক কাজের নগদ ৮০,৪০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে সেলিম উল্লাহ বলেন । পরবর্তীতে সহকর্মীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এবং প্রাথমিক চিকিৎসা করান।

চিহ্নিত হামলাকারী ও থানায় এজাহারের আবেদন:
ঘটনার পর ভুক্তভোগী সাংবাদিক সেলিম উল্লাহ কোতোয়ালী থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের আবেদন করেন। তার বর্ণনা মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সিআইপি মুজিবের বড় ভাই আজিজ গং রাস্তার অপর পাশে থেকে আক্রমণকারীদের নির্দেশ দেয়। এজাহারের আবেদনে ৩ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন- আজিজুর রহমান (পিতা- মৃত মাস্টার নজির আহাম্মদ, সাং- জঙ্গল নাপোড়া, পুইছড়ি ইউনিয়ন, বাঁশখালী; বর্তমান সাং- ভুইয়া গলি, চন্দনপুরা, চকবাজার, চট্টগ্রাম)- সিআইপি মুজিবের বড় ভাই।

জাকের আহাম্মদ ওরফে সোনা জাকের (পিতা- আবুল খায়ের, সাং- জঙ্গল নাপোড়া, পূর্ব চারিয়া পাড়া, পুইছড়ি ইউনিয়ন, বাঁশখালী)।

প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন (পিতা- মাস্টার ফেরদৌস, সাং- কাজী বাড়ি, ৬নং ওয়ার্ড, গণ্ডামারা ইউনিয়ন, বাঁশখালী; এবং স্বত্বাধিকারী, স্বাদবাড়ি রেস্টুরেন্ট, শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এখনো মামলা নেয়নি পুলিশ:
প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মেডিকেল রিপোর্ট, কোতোয়ালী থানার এসআই এবং পরবর্তীতে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা এবং সিসি ফুটেজ ও অর্ধশতাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও মামলা নেয়নি কোতোয়ালী থানা পুলিশ। বারবার থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করা হলেও পুলিশ কালক্ষেপণ করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

সাংবাদিক সমাজের প্রশ্ন- একজন পেশাদার সংবাদকর্মীর ওপর এমন অমানবিক হামলার ঘটনায় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করলে সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? অবিলম্বে সিআইপি মুজিবের অনুসারী চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

ক্যাটাগরি