দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুল
মো. জয়নাল আবেদীন, কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তবর্তী জনপদ। চারদিকে পাহাড় আর সবুজ অরণ্য। যোগাযোগব্যবস্থাও দুর্গম। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে নৌপথে প্রায় দুই ঘণ্টা যাওয়ার পর আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে এগোতে হয়। এমন দুর্গম এলাকায় যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছানোই কঠিন, সেখানে শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি এখন আশপাশের পাঁচটি পাড়ার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম আশ্রয়স্থল। বর্তমানে এখানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এলাকার সব শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চলে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ পথ, পারিবারিক আর্থিক সংকট ও শিক্ষার প্রতি সচেতনতার অভাবে বহু শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতো। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি পরিবারগুলোর একটি অংশের আগ্রহ কম থাকায় তারা শিক্ষার সুযোগ থেকে আরও বেশি পিছিয়ে পড়ছিল।
স্থানীয় শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার পথ সহজ করতে চারপাশের পাঁচটি পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আশপাশের দুর্গম জনপদ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে পড়াশোনা করছে। কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী তিন উপজেলা সীমান্তবর্তী এলাকার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে।
বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা জানান, এলাকাটির অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। অনেক পরিবার এখনো শিক্ষা থেকে পিছিয়ে রয়েছে এবং অভিভাবকদের বিশাল একটি অংশ নিরক্ষর। ফলে সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো এবং শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুকে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে হয়। আবার দীর্ঘ পথ ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেননি। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের পড়াশোনার বিষয়ে এখনো অনেক পরিবার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
এই পরিস্থিতিতে নিজ এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশুদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান শিক্ষক ও প্রধান উদ্যোগতা ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা) বলেন, “বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু আশপাশের পাড়াগুলোতে এখনো অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। অভিভাবকদের সচেতন করে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হবে।”
তিনি বলেন, “বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি অনেক পরিবার এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। তাদের শিক্ষার আওতায় আনা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। এই এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে দুর্গমতা, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”
বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু আরও বলেন, “শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই কাজ শেষ হয় না। শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, অভিভাবকদের সচেতন করা, শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষার মান ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের কল্যাণ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চন্দ্রজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সহজ নয়। দীর্ঘ পথ, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ও পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও বিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। আগে এখানে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। এখন অন্তত এই এলাকার শিশুরা নিজেদের কাছাকাছি একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। আমরা চাই, দুর্গমতার কারণে আমাদের কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে বিদ্যালয়টি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।”
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করলেও আশপাশের পাড়াগুলোতে এখনো অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হতে পারে। এজন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য নয় এর মাধ্যমে একটি দীর্ঘদিন শিক্ষাবঞ্চিত জনপদের সামাজিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার সুযোগ পেলে এই পাহাড়ি এলাকার শিশুরাও ভবিষ্যতে নিজেদের জীবন ও সমাজকে বদলে দিতে পারবে এমন প্রত্যাশাই এখন বিদ্যালয়টির সঙ্গে জড়িত শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের।