চট্টগ্রাম, রোববার, ২১ এপ্রিল ২০২৪ , ৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যেসব কারণে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দুর্বল

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ৬:০৪ : অপরাহ্ণ

 

পাসপোর্ট সূচকে এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২তম।  ২০২৩ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১তম।  যৌথভাবে একই অবস্থানে ছিল কসোভো ও লিবিয়া। মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট সূচক প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স। সর্বশেষ এই সূচকে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ১০২তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। যদিও এর আগে পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশ ১০১তম স্থানে ছিল।

জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে ভারত, মালদ্বীপ, ভুটার ও শ্রীলঙ্কা এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া পাসপোর্ট তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে সুদান, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, লাইবেরিয়া এবং কঙ্গোর মতো আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশগুলোও। অগ্রিম ভিসা ছাড়াই একটি দেশের নাগরিক বিশ্বের কতটি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন, সেটির উপর নির্ভর করেই তালিকায় প্রতিটি দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স।

এদিকে বলা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে।  ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদাও পাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এতকিছুর পরও পাসপোর্টের মর্যাদার দিকে থেকে বাংলাদেশ কেন তলানির দিকে অবস্থান করছে?

 

এই সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা অগ্রগতি সাধন করলেও সুশাসন ও মানব উন্নয়ন সূচকসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, এসব জায়গায় পিছিয়ে থাকার কারণে অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, সেটির উপর নির্ভর করেই তারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট তথা নাগরিকদের মূল্যায়ন করছে।

এদিকে একটি দেশের মানব উন্নয়ন সূচকের তথ্য দিয়ে দেশটির ভাবমূর্তি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।  এই সূচক তৈরির ক্ষেত্রে একটি দেশের মানুষের গড় আয়ু, শিক্ষার হার, সুস্বাস্থ্যকর জীবন, মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মান, দরিদ্রতার হার, আয়ের বৈষম্য, আমদারি-রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ অপরাধ প্রবণতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

 

হুমায়ুন কবির বলেন, তালিকায় বাংলাদেশ পেছনে পড়ে গেছে, কারণ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়নি।

এছাড়া দুর্বল পাসপোর্ট হিসেবে বিবেচনা করার আরও কিছু কারণ রয়েছে এর মধ্যে একটি হচ্ছে জাল পাসপোর্ট।  যেসব দেশে সহজেই জাল পাসপোর্ট করা হয় যেসব দেশের পাসপোর্ট সাধারণত দুর্বল হিসেবে গণ্য করা হয়।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, একজন পাসপোর্টধারী তার নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।  কিন্তু সেটি যদি জাল হতে থাকে, তাহলে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এদিকে পাসপোর্ট সূচকে পিছিয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে মানবপাচার।  জাতিসংঘ বলছে, সরকারের নানা তৎপরতার পরও বাংলাদেশ থেকে এখনও মানবপাচারের মতো ঘটনা ঘটছে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশ থেকে মানব পাচার হওয়ার অর্থ হচ্ছে দেশটি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সেখানে অপরাধীদের সক্রিয় চক্র রয়েছে।  এটি একটি দেশের পাসপোর্টকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

এছাড়া অবৈধ পথে বিদেশ গমন, কর্ম দক্ষতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সুশাসনের জন্য পাসপোর্ট দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, যেই দেশগুলোর পাসপোর্টের মূল্য বেশি, মনে করা হয় যে ঐ দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো শক্তিশালী, তাদের অর্থনীতি ভালো, তাদের শাসন ব্যবস্থা ভালো এবং বর্হিবিশ্বের কাছে তাদের একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।

তার মতে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো সম্ভব নয়।

 

 

পাসপোর্ট সূচকে প্রথম অবস্থানে যৌথভাবে আছে ছয়টি দেশ। এগুলো হলো- ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, সিঙ্গাপুর ও স্পেন। এই দেশগুলোর পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৯৪টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। সূচকের তথ্যমতে, এখন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৪২টি দেশ ভ্রমণ করতে পারেন। অবশ্য ২০২৩ সালের সূচক অনুযায়ী, এই সংখ্যা ছিল ৪১।

 

 

বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট নিয়ে সূচকটি তৈরি করা হয়।  সূচকে বাংলাদেশের ওপরে ১০১তম অবস্থানে আছে ইরিত্রিয়া ও শ্রীলঙ্কা।  বাংলাদেশের নিচে ১০৩তম অবস্থানে আছে লিবিয়া, নেপাল ও ফিলিস্তিন।

সূচকে বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ৮৫তম। ভারতের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৬২টি দেশ ভ্রমণ করতে পারেন।সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৬তম।  পাকিস্তানের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৩৪টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।  সূচকে সবার নিচে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ২৮টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।

 

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Print Friendly and PDF