চট্টগ্রাম, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪ , ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চাঁদপুরে কেঁচো সার উৎপাদনে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর, ২০২৩ ৩:২৬ : অপরাহ্ণ

 

চাঁদপুরে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছেড়ে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) সারের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা। রাসায়নিক সারের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে এই জেলার কৃষকেরা এখন ব্যাপক হারে ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার শুরু করেছেন। ফলে জেলার বিভিন্নস্থানে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের উৎপাদন।

মাটির উর্বরা শক্তি বাড়িয়ে চাষে উপকারিতা পাওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ায় জেলায় কৃষকরাও দিন দিন কম্পোস্ট সার ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। অনেক কৃষি উদ্যোক্তাই এখন বাণিজ্যিকভাবে এ সার উৎপাদন করছেন।

ইতোমধ্যে চাঁদপুর জেলায় ১৪ জন কৃষি উদ্যোক্তা কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করে এখন বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন করছেন। তাদের পাশাপাশি নতুনদের সব ধরণের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

জানা যায়, জমিতে অতিমাত্রায় বালাইনাশক, আগাছানাশক, কৃত্রিম রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় দিন দিন মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে ভূমিকা রাখছে কেঁচো সার। রাসায়নিক সার ব্যবহারে বিনষ্ট মাটির উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম এই ভার্মি কম্পোস্ট।

 

কৃষি উদ্যোক্তারা জানান, পরিবেশবান্ধব কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন করতে অর্ধ পচা গোবর, শাকসবজির ফেলে দেয়া অংশ, অথবা পচা কলাগাছ একসঙ্গে মিশিয়ে সেখানে কেঁচো ছেড়ে দেয়া হয়। কেঁচো সেসব ময়লা খেয়ে মলত্যাগ করে ও বংশবিস্তার করে। কেঁচোর মলই মূলত জৈব সারে পরিণত হয়। জৈব সারে পরিণত হতে সময় লাগে ১ থেকে দেড় মাস। তারা বিভিন্ন নার্সারি, কৃষক এবং দোকানদারের মাধ্যমে এই জৈব সার বিক্রয় করেন।

চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের কাঠের পোল এলাকার শহীদুল্লাহ পাটোয়ারীর ছেলে তরুণ উদ্যোক্তা ফয়সাল পাটোয়ারী শুভ (৩২)। তিনি চাকরির পাশাপাশি একটু বাড়তি আয়ের আশায় কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদনের জন্য উদ্যোগ নেন। তার এ সার কোম্পানির নাম দেন পাওয়ারী জৈব সার কোম্পানি লিমিটেড। এ সার উৎপাদন করে মাত্র ৪ মাসের মধ্যে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। বর্তমানে ফয়সাল পাটোয়ারী শুভর উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭ থেকে ৮ টনের বেশি কেঁচো সার বাজারজাত করা হয়। এতে তিনি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন।

 

তরুণ উদ্যোক্তা ফয়সাল পাটোয়ারী শুভ জানান, তার এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। পরে চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর ইউনিয়নের রঙেরগাঁও এলাকায় ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন জন্য পরিত্যক্ত ৮ শতক জমি ভাড়া করে আটটি হাউস নির্ধারণ করেন। চলতি বছর মার্চ মাসে সাত লাখ টাকা খরচ করে ৫০ হাজার কেঁচোসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ নিয়ে এই প্রোজেক্ট চালু করেন।

 

নিজের পরিশ্রমের ফলে মাত্র চার মাসে ব্যাপক সফলতা পান এ উদ্যোক্তা। ওই বছরের জুলাই মাসে তিনি বিক্রয় শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ৩টি রিং, আটটি হাউজ রয়েছে। এখান থেকে প্রতি মাসে ৭-৮টন জৈব সার উৎপাদন হয়। পাইকারি মূল্যে প্রতি কেজি জৈব ২৫-৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। শ্রমিকদের পাশাপাশি বিক্রয় সরবরাহের জন্য দুইজন এসআর (সেলম্যান) আছেন। তারা বিভিন্ন নার্সারি, কৃষক এবং দোকানদারের মাধ্যমে আমরা এই জৈব সারটি বিক্রয় করে থাকি। ৫৫-৬০ হাজার বিক্রয় হয়। তাদের বেতন দেয়ার পর ফয়সালের মাসে গড়ে ২৫ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা লাভ হয়।

 

ফয়সাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ সার উৎপাদনের জন্য যখন গুরুত্ব দিলেন। তখন থেকে এ বিষয়ে আমার খুবই আগ্রহ জাগে। তবে খরচ অনুযায়ী কম দরে বিক্রয় হয় এই সার। এক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ফয়সাল পাটোয়ারী শুভর ভার্মি কম্পোস্ট প্রজেক্টে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত জায়গা জুড়ে প্রায় ৩টি রিং,আটটি হাউজ রয়েছে। যার ১৪ ফুট লম্বা পাশে ১০ ফুট নিয়ে তৈরি করেছেন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন কেন্দ্র। এতে পুরনো গোবর আর রেড বেঙ্গল কেঁচো দিয়ে রিংও হাউসগুলো ঢেকে রেখেছেন। প্রতিটি হাউজে ১ লাখ এবং রিংয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার কেঁচো রয়েছে। কেঁচো গুলো হাউজ এবং রিংয়ের গোবর খেয়ে মলত্যাগ করে। এই মল চা পাতার মতো হালকা আর ঝুর ঝুর হয়ে হাউস এবং রিংয়ের ওপর দিকে উঠতে থাকে। প্রথম দেড় মাস পর প্রতি হাউজে দেড় টন এবং রিংগুলো থেকে ২৫-৩০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরি হয়।

 

স্থানীয় কৃষক সোহেল খান বলেন, শুভ আমাদের গ্রামের ছেলে তার কাছ থেকে জৈব সার নিয়ে কলা বাগানে দিছিলাম সঙ্গে লাল শাক খেতেও দিছি। কলা ও শাকের বাম্পার ফলন হয়েছে। সেই সঙ্গে রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে যে খরচ হতো তার থেকে অনেক কম খরচ হয়েছে।

এদিকে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল গ্রামের আবুল কালামের ছেলে জাকির হোসেন ভূঁইয়া সোহাগ (৩১) নামে এক যুবক টার্কি পালন ছেড়ে ২০১৯ সালে দশ কেজি কেঁচো ক্রয় করে ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছেন। বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশনের আবেদনও করেন তিনি।

 

হাজীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলরুবা খানম বলেন, রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজন। এর কারণ হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। আমার উপজেলার জাকির ও শাকিল নামে দুই যুবক অগ্রগামী কৃষক। তারা এধরনের জৈব সার উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। আমাদের মাধ্যমে তারা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষণের পর তারা নিজেরাই বুঝতে পেরেছে এই সার ব্যবহারে ফলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা লাভবানও হচ্ছে। তারা এখন চিন্তা করছে বাণিজ্যিকভাবে এটি চাষ করবে। তাই তারা বড় পরিসরে কাজ করা জন্য পরিকল্পনা করছে। এ জন্য আমরা তাদের পাশে আছি। ইতোপূর্বে তাদের দেওয়া দুটি স্যাম্পল পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি। এগুলোর ফলাফল ভালো এসেছে। তাদের খামারগুলো সরকারিভাবে নিবন্ধনের জন্য কাজ করা হচ্ছে। আমি তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করছি এ পেশায় এগিয়ে আসার জন্য। কারণ, এগুলো লাভজনক চাষ।

 

চাঁদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তপন রায় বলেন, ফয়সাল পাটওয়ারী একজন কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কেঁচো সার এক ধরনের জৈব সার। এটি ব্যবহার করলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অধিক ফলন, নিরাপদ ফসল এবং সবজি উৎপন্ন হয়। আমরা আশাবাদী উদ্যোক্তা ফয়সালের মতো এমন উদ্যোগে এগিয়ে আসবে বেকার যুবকরা। তারা নিরাপদ সবজি উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে। আমরা তাদের সহায়তা দেব।

 

চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাফায়েত আহম্মদ সিদ্দিকী জানান, জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিবেশবান্ধব কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদনে ১৪ জন উদ্যোক্তা আছেন। তাদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের কারণে আরও নতুন নতুন কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের কারণে নতুন উদ্যোক্তারাও লাভবান হচ্ছে। ভার্মি কম্পোস্ট সার প্রাকৃতিকভাবে খুবই নিরাপদ। মাটির গুনাগুণ রক্ষার্থে কাজ করে। জৈব সার বৃদ্ধিতে ভার্মি কম্পোস্ট ভালো ভূমিকা রাখে। যে সব নতুন নতুন উদ্যোক্তা এ পেশায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করছে, তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পুরাতন উদ্যোক্তাদের কেঁচো সংগ্রহ করে নতুন উদ্যোক্তাদের নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

 

 

সুত্র: চ্যানেল২৪

Print Friendly and PDF