চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪ , ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অর্ধেকে নেমেছে জিরা আমদানি, দাম বেড়েছে কেজিতে ২০০ টাকা

প্রকাশ: ১৬ মে, ২০২৩ ৩:৫৯ : অপরাহ্ণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভারতে এবার জিরার উৎপাদন কমায় সেদেশেই অনেকটা মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কমেছে ভারত থেকে জিরার আমদানি। এতে করে দেশের বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমায় পণ্যটির দাম হু হু করে বাড়ছে।

অনেক ব্যবসায়ী পূর্বের আমদানিকৃত জিরা মজুদ রেখে দাম বাড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি জিরাতে প্রায় ২০০ টাকা করে বেড়েছে। হঠাৎ করে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।

হিলি কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে এপ্রিল মাসে ৮৫টি ট্রাকে ২ হাজার ৩৯১ টন জিরা আমদানি হয়েছে। যেখানে গত মার্চ মাসে বন্দর দিয়ে ১৫৬টি ট্রাকে ৪ হাজার ২৭৬ টন জিরা আমদানি হয়েছিল।

 

 

হিলি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে প্রায় সব মুদি দোকানেই জিরাসহ সবধরনের মসলার যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে তারপরেও দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। চার থেকে পাঁচ দিন পূর্বে প্রতি কেজি জিরা ৮২০ টাকা বিক্রি হলেও কিছুটা কমে বর্তমানে দোকানগুলোতে প্রতি কেজি জিরা ৭৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে যা ঈদের পূর্বে ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।

হিলি বাজারে জিরা কিনতে আসা আইয়ুব হোসেন বলেন, জিরার দাম এই কদিনের ব্যবধানে হু হু করে বেড়ে গেলো। ঈদের আগে যে জিরা কিনলাম ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে সেই জিরা দাম বাড়তে বাড়তে ৮২০ টাকায় উঠেছিল, এখন হয়েছে ৭৯০ টাকা, কেউ কেউ ৮০০ টাকাও চাইছে জিরার দাম। এত দাম বাড়ার কারণে আমাদের মত মানুষদের মসলা খাওয়ার পরিবেশ উঠে যাচ্ছে। এত দাম দিয়ে মসলা খাওয়া সম্ভব নয় তাই মসলা ছাড়াই এখন তরকারি খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে এছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই আমাদের।

 

 

অপর ক্রেতা ইয়াসিন আলী বলেন, জিরার দাম অত্যধিক বেড়ে গেছে কেজিতে ২০০ টাকা করে বেড়েছে। এতে করে আমাদের মত মানুষদের কিনতে যেমন অসুবিধা হচ্ছে তেমনি এত দাম দিয়ে কিনে খাওয়াও আমাদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে আগে যেখানে হাফ কেজি জিরা কিনতাম সেখানে এখন একশো গ্রাম জিরা কিনছি। দামটা যদি কমে তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়।

 

 

অপর ক্রেতা সিদ্দিক হোসেন বলেন, বাজারে জিরা কিনতে এসে রীতিমত অবাক, যেখানে রমজান মাসে জিরা কিনলাম ৫৯০ টাকা কেজি দরে সেখানে এখন কিনতে এসে দাম শুনি ৭৯০টাকা কেজি। যেখানে এক কেজি কিনতে এসেছিলাম সেখানে হাফ কেজি কিনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। দাম বাড়ার কারণে আমাদের মত সাধারণ মানুষদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমরা চাই জিরার দামটা যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে যাতে করে আমাদের মত মানুষদের জন্য সুবিধা হয়।

 

 

হিলি বাজারের মসলা দোকানী গোলাম মর্তুজা শিফাত বলেন, ঈদের আগে আমরা জিরা বিক্রি করেছি ৫৮০ টাকা করে এমনকি সাতদিন পূর্বেও আমরা জিরা বিক্রি করেছি ৬৭০ টাকা কেজি দরে। জিরা বিক্রি শেষে যখন আমরা জিরা কিনতে যায় তখন দেখি দাম ৭০০ টাকা ছাড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই জিরার দাম বাড়ছে যা ৮২০ টাকায় উঠেছিল সেই ধারা থেকে কিছুটা কমতে শুরু করেছে দাম। বর্তমানে জিরা ৭৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করা হচ্ছে। বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে যার কারণে আমাদের বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে করে ক্রেতাদের সহিত প্রতিটি মুহূর্তে বাকবিতণ্ডায় জড়াতে হচ্ছে তাদের সঙ্গে বাড়তি কথা বলতে হচ্ছে বুঝাতে হচ্ছে। কেন জিরার দাম বাড়ছে কয়েকদিন আগেই তো জিরার দাম কম ছিল এরকম নানা কথাবার্তা বলছে। জিরার উৎপাদন কম হওয়ায় ও আমদানি কমের কারণেই নাকি জিরার দাম বাড়ছে বলে আমদানিকারকরা আমাদের বলছেন।

হিলি স্থলবন্দরের জিরা আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ভারতে যে পরিমাণ জিরা উৎপাদন হয় সেই তুলনায় এবারে অন্যান্য বছরের তুলনায় ৩০ ভাগ জিরা উৎপাদন হয়েছে। যার কারণে তাদের দেশেই নাকি জিরা সংকট রয়েছে বলে রপ্তানিকারকরা আমাদের জানিয়েছেন। এতে করে ভারতের বাজারেই জিরার দাম ঊর্ধ্বমুখী যার কারণে রপ্তানিকারকরা এর মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এমনকি তারা জিরা রপ্তানি করতেই চাচ্ছেন না এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। পূর্বে সব আমদানিকারকেরই কম বেশি জিরা বন্দর দিয়ে প্রবেশ করতো কিন্তু এখন মুষ্টিমেয় দু-একজন আমদানিকারকের জিরা প্রবেশ করছে। জিরার যেমন এলসি কম হচ্ছে, তেমনি জিরা আমদানিও কম হচ্ছে। যাদের কাছে পূর্বের আমদানিকৃত জিরা রয়েছে তারা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। তবে বন্দর দিয়ে সচরাচর আমদানি হয় তাহলে দাম কমে আসবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

 

 

হিলি স্থলবন্দরের সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট শেরেগুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভারতে এবারে জিরার উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমের কারণে দাম ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু সেই তুলনায় দেশের বাজারে জিরার দাম না বাড়ায় লোকসানের আশংকায় আমদানিকারকরা জিরার আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন।

 

 

জিরার এলসি মূল্য বেশি হওয়ায় বেশি ডলারের প্রয়োজন হয় কিন্তু ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো চাহিদা মাফিক জিরার এলসি খুলছে না এর কারণেও জিরার আমদানি কমেছে। এছাড়া যে ডলার রেটে ভারত থেকে জিরা আমদানি করা হচ্ছে কিন্তু পরবর্তীতে সেই পণ্যটির বিল ছাড়তে গিয়ে পূর্বের মূল্যের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত টাকা বাড়তি মূল্যে পরিশোধ করতে হচ্ছে। যার কারণে আমদানিকারকরা পণ্য আমদানি করে লোকসানের মুখে পড়ছেন এই ভয়ে অনেক আমদানিকারক জিরা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

 

 

হিলি স্থলবন্দর আমদানি রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূলত ভারতের বাজারে জিরার দাম বাড়ার কারণে দেশের বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ছে। যেখান থেকে পণ্যটি আমদানি করা হচ্ছে সেখানেই পণ্যটির সংকট যার কারণেই দাম বাড়ছে। বাস্তবে আমাদের দেশে পণ্যটির ট্যাক্স আগের তুলনায় বাড়েনি বা ট্যাক্স রেট বাড়েনি। পূর্বে প্রতি কেজি জিরা আমদানিতে ৯৬ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হতো এখন শুধুমাত্র ডলার রেট বাড়ার কারণে কেজি প্রতি ১০ টাকা বেড়ে তা ১০৬ টাকা হয়েছে। এছাড়া জিরা পূর্বে অন্যান্য দেশ থেকে পানি পথে জাহাজে করে আমদানি করা হতো কিন্তু ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে সেই পথ দিয়ে আমদানির পরিমাণটা কমে গিয়েছে যার কারণে ভারতের জিরার উপর চাপ পড়ে যাওয়ায় দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে সামনে যেহেতু ঈদুল আযহা এ সময়ে মসলার বাড়তি চাহিদা থাকে। তাই এ সময়ে ভারতের পাশাপাশি অন্য দেশ থেকে এই পণ্যটি আমদানি করা হয় তাহলে দাম কমে আসবে তা না হলে দাম আরও বাড়তে পারে।

 

 

হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বলেন, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে জিরা আমদানি অব্যাহত রয়েছে। তবে আমদানির পরিমাণটা পূর্বের চেয়ে খানিকটা কমে গিয়েছে। পূর্বে যেখানে বন্দর দিয়ে ১৫ থেকে ২০ ট্রাক জিরা আমদানি হয়েছিল বর্তমানে তা কমে ৩ থেকে ৫ ট্রাকে নেমেছে। জিরা আমদানির ক্ষেত্রে এর রাজস্ব অনেকটা বেশি যার কারণে এই পণ্যটির আমদানি কমের ফলে সরকারের রাজস্ব যেমন কমেছে তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন আয় কমেছে। সেই সঙ্গে বন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের আয় কমে গিয়েছে।

 

 

সূত্র – চ্যানেল২৪

Print Friendly and PDF