চট্টগ্রাম, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২ , ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

তিস্তা ইস্যুতে ভারতকে উদার হওয়ার আহবান প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ৩:২১ : অপরাহ্ণ

অভিন্ন নদীগুলোর ভাটিতে থাকায়, বাংলাদেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নদী নিয়ে ভারতের ভেতরই সমস্যা আছে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) থেকে চারদিনের ভারত সফর শুরু করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরের আগে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

এএনআই শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটি রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) তাদের ওয়েব সাইটে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশ করেছে। এতে দুদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা ইস্যু ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নদীর পানি বণ্টনে বিশেষ করে তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে তার দেশের সহযোগিতার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশে ভারত থেকে পানি আসে, তাই ভারতের আরও উদারতা দেখাতে হবে। কারণ এতে উভয় দেশই লাভবান হবে। কখনও কখনও পানির অভাবে আমাদের জনগণও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না পেয়ে বিশেষ করে তিস্তায় আমরা ফসল রোপণ করতে পারিনি এবং আরও অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই আমি মনে করি এর সমাধান হওয়া উচিত। অবশ্য, হ্যাঁ আমরা দেখেছি- ভারতের প্রধানমন্ত্রী (মোদি) …আপনি জানেন… এই সমস্যাটি সমাধান করার জন্য অনেক আগ্রহী, কিন্তু সমস্যাটি আপনার দেশেই। তাই… আমরা আশা করি এটি (সমাধান) হবে, আপনি জানেন… এটি সমাধান করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, দুই দেশ গঙ্গা নদীর পানি ভাগ করে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুধু গঙ্গার পানিই আমরা ভাগাভাগি করেছি। এই পানির বিষয়ে আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু আমাদের আরও ৫৪টি নদী আছে। হ্যাঁ… এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, তাই এটি সমাধান করা উচিত।’

দেশের অর্থনীতি নিয়ে করা এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেক শক্তিশালী। এখানে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না।

শেখ হাসিনা কাছে প্রশ্ন ছিলো, ভারত ও চীন- দুই দেশের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সাফ জবাব, দেশের উন্নয়নের জন্য যে কারো সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করবে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন,  আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খুবই পরিষ্কার—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে এটা বলেছিলেন জাতিসংঘে। আমরা তার সেই মতাদর্শ অনুসরণ করে চলি। আমি মনে করি, আমাদের উচিৎ জনগণকে কেন্দ্র করে কাজ করা। কীভাবে তাদেরকে আরও ভালো জীবন দেওয়া যায়, কীভাবে তাদের জীবনমান আরও ভালো করা যায়। আমি সব সময়ই বলি, আমাদের একমাত্র শত্রু দরিদ্রতা। কাজেই চলুন একসঙ্গে কাজ করি, দরিদ্রতা কমাতে। দক্ষিণ এশিয়া, চীন— সব জায়গাতেই জনগণের জন্য একটি উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের কাজ করতে হবে, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি মনে করি, ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থেকেও থাকে, সেখানে আমি নাক গলাতে চাই না। আমি চাই আমার দেশের উন্নয়ন। ভারত আমাদের ঠিক পাশের রাষ্ট্র, সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। আমাদের মধ্যে খুবই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে সমস্যা রয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে আমরা এর মধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি। আপনি জানেন, পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত সমস্যা সমাধান হয়েছে। ২ দশক ধরে ভারতে থাকা আমাদের রিফুজিদের আমি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তির সময় তাদেরকে সেটেল করেছি।

তিনি বলেন, আমি মনে করি ছিটমহল বিনিময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অনেক দেশ এর জন্য যুদ্ধ করে, কিন্তু আমরা তা করিনি। বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যার সমাধান করেছি এবং ছিটমহল বিনিময় করেছি। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সব সংসদ সদস্যদের এবং ভারত সরকারকে—তারা আইন পাশ করায় এই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, অনেকে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশ থেকে আমাকে এই প্রশ্ন করেন। ভারত ও চীন উভয় দেশের জন্যই আমার মনে হয়, আমাদের যুদ্ধ করা উচিত না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোনো সমস্যা থাকলে তা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা উচিত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি পাশাপাশি থাকবেন, তখন কিছু সমস্যা আসবেই, থাকবেই। সেগুলো আপনি সমাধান করতেই পারেন। আমাদের কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং নিজেরা সমাধান করে নিতে পারব।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধাণে ভারত মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার এখন নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছি। এই সমস্যা সমাধানে প্রতিবেশী ভারত মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার মানবিক দিকটি বিবেচনা করে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার যত্ন নিচ্ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গার আমাদের জন্য বড় একটি বোঝা। ভারত বড় একটি দেশ, সেখানে থাকার জায়গা অনেক হলেও কিন্তু দেশটিতে খুব বেশি রোহিঙ্গা নেই। আর আমাদের দেশে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ে আছে। এই সমস্যাটি সমাধানে ভারত ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিই। তাদের সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে করোনা মহামারির সময়ে টিকার আওতায় এনেছি। কিন্তু তারা আর কতদিন এখানে থাকবে? তারা এখন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। আমাদের পরিবেশকে বিপজ্জনক করে তুলছে। রোহিঙ্গাদের কিছু অংশ মাদকপাচার, অস্ত্র ব্যবসা, নারী পাচারসহ নানান সহিংসতায় জড়িয়ে পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তারা যত দ্রুত দেশে ফিরবে আমাদের এবং মিয়ানমারের জন্য মঙ্গলজনক। আমাদের দিক থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাদের প্রত্যাবাসনে আসিয়ান, ইউএনওসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। এ ক্ষেত্রে ভারত বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।

Print Friendly and PDF