সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক্সক্লুসিভ

সবাই যাকাত দিলে দেশে গরীব থাকবেনা

বাংলাদেশে যত ধনী আছে তারা যদি জাকাত দেন তাহলে আগামী পাঁচ বছরে একজনও দরিদ্র থাকবে না। সবাই জাকাতদাতা হয়ে যাবে। মানুষের রচিত আইনকানুনের কারণে যে বৈষম্য, জুলুম ও শোষণ সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে সমাজকে বের করে এনে সুন্দর স্বচ্ছন্দ জীবন এবং ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে কেবল জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি।

জাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু না হলে এদেশে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। এটি চালু করতে হলে ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব না।

যাকাত ইসলামি অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার একটি সুসংগঠিত স্তম্ভ, যা সঠিকভাবে কার্যকর করলে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব।

‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ (নির্ধারিত সীমা) সম্পদের মালিক হলে বছর শেষে তার একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) অভাবী ও দুস্থদের মাঝে বণ্টন করা বাধ্যতামূলক। এটি কেবল দয়া বা দান নয়, বরং ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের প্রাপ্য অধিকার।

জাকাত। ইসলামের এক শাশ্বত বিধান। নিছক ইবাদত ছাড়াও এতে রয়েছে আত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষ। জাকাত যেমনিভাবে মুসলিমদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বিধান করে, তেমনি ধনী-গরিবের বৈষম্যেরও হ্রাস ঘটায়। জাকাত হলো আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। কোনো সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ও দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচার হাতিয়ার। জাকাত বিধানের যথাযথ প্রয়োগ হলে সমাজে সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায়-দুস্থ মানুষ যেমন থাকবে না, তেমনি মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতির হাতে একতরফা সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠারও সুযোগ থাকবে না।

জাকাত ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হলো জাকাত। কুরআন মাজিদের অনেক আয়াতে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের আদেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘তোমরা সালাত আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ (সূরা বাকারা-১১০) এছাড়া জাকাত প্রকৃত পুণ্যশীলের পরিচয়, মুমিনের বন্ধু, সৎকর্মপরায়ণদের বৈশিষ্ট্য, মসজিদ আবাদকারী, কুরআন মাজিদে যাদের জন্য রয়েছে শুভ সংবাদ, যাদেরকে বলা হয়েছে হেদায়েতপ্রাপ্ত, ভূপৃষ্ঠে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভকারী মুমিনের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদিসহ দ্বীনের মৌলিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও সালাত-জাকাতের বিষয়টি অবধারিতভাবেই আসে।

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইসলামের স্তম্ভ পাঁচটিÑ এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ করা ও রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি-০৮) ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রাহ. বলেন, ‘জাকাত শরিয়তের এমন এক অকাট্য বিধান, যে সম্পর্কে দলিল-প্রমাণ দিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। জাকাত সংক্রান্ত কিছু কিছু মাসয়ালায় ইমামদের মতভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়ে অর্থাৎ জাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে কোনো দ্বিমত নেই। জাকাতের ফরজিয়তকে যে অস্বীকার করে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।’ (ফাতহুল বারি-৩/৩০৯)

একজন ব্যক্তির মুসলমান হওয়া এবং তার ঈমান প্রকাশের একটি উপায় হলো জাকাত। কুরআন মাজিদে সালাত আদায় করা ও জাকাত প্রদানকে মুসলিম হওয়ার আলামত সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘এরপর যদি তারা (কাফেররা) তওবা করে, নামাজ আদায় করতে শুরু করে এবং জাকাত দিতে শুরু করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। বাস্তবিকপক্ষেই আল্লাহ বড় ক্ষমাশীল এবং বড় অনুগ্রহকারী।’ (সূরা তাওবা-০৫)
অউঠঊজঞওঝঊগঊঘঞ

আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমাকে মানুষের সাথে লড়াই করার আদেশ করা হয়েছে, যতক্ষণ না তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যতক্ষণ না তারা নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে। তারা যদি এটা করে, তাহলে নিজেদের প্রাণ ও সম্পদকে হিফাজত করল। যদি না ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রাণ ও সম্পদের নিরাপত্তা রহিত হয়। আর তাদের (অন্তরের অবস্থার) হিসাব আল্লাহর উপর।’ (সহিহ বুখারি-২৫)
জাকাতের মাধ্যমে মানবাত্মা পরিশুদ্ধ হয়। কৃপণতা, স্বার্থপরতা, আমিত্ব ইত্যাদি আত্মিক ব্যাধি থেকে জাকাত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আর ফকির-মিসকিনদের প্রতি উদাসিনতা প্রদর্শন থেকেও মনকে পবিত্র করে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘আপনি তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদেরকে পাক-পবিত্র করবেন।’ (সূরা তাওবা-১০৩)
সম্পদের যথাযথ জাকাত আদায় করলে একদিকে যেমন মন ও আত্মার পরিশুদ্ধি হয়, তেমনি অনাথ-অসহায়ের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে সম্পদে পবিত্রতা ও খায়ের-বরকত আসে। আর আল্লাহ তায়ালা এর সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করতে থাকবেন। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘আর যা তোমরা এই উদ্দেশ্যে দেবে যে, তা মানুষের সম্পদে পৌঁছে বর্ধিত হয়ে আসবে, তা আল্লাহর কাছে বর্ধিত হয় না। আর যা জাকাত দেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়Ñ তো এমন মানুষই আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি করতে থাকবে।’ (সূরা রূম-৩৯) আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সদকা দ্বারা সম্পদের হ্রাস ঘটে না। বান্দার ক্ষমার কারণে আল্লাহ তার সম্মানই বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বনকারীকে আল্লাহ মর্যাদাবান করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম-২৫৮৮)
ইসলাম যেমন ব্যক্তিকে সম্পদের জাকাত প্রদানের আদেশ দিয়েছে, তেমনি ইসলামি শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্রকে জাকাত উসুল করা এবং এর সুষম ও ইনসাফভিত্তিক বণ্টনেরও বিধান দিয়েছে। যার দরুন জাকাত আর্থসামাজিক কল্যাণ ও মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করে। জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের একটি কল্যাণকর ও ইনসাফভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে, যা একটি সমাজের স্বনির্ভরতা অর্জন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণ ও সমাজের সব মানুষের সম্মানজনক জীবন যাপনের সুযোগ সৃষ্টির এক কার্যকরী ব্যবস্থা।

দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের প্রভাব:
ক্সসম্পদের সুষম বণ্টন: যাকাত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সম্পদ যেন কেবল ধনীদের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, বরং তা সমাজের সর্বস্তরে প্রবাহিত হয়। এর মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বিশাল বৈষম্য হ্রাস পায়।

কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা: যাকাত থেকে প্রাপ্ত অর্থ যদি শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্যের পেছনে ব্যয় না করে কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তবে একজন যাকাতগ্রহীতা ভবিষ্যতে যাকাতদাতায় পরিণত হতে পারেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারিগরি শিক্ষা বা গবাদি পশু কিনে দেওয়ার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব।

অর্থনৈতিক গতিশীলতা: যাকাতের অর্থ যখন অভাবীদের হাতে যায়, তখন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এটি বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি করে এবং পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (এউচ) অবদান রাখে।

সফলতার সম্ভাবনা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সকল নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি নিয়মিত ও সঠিকভাবে যাকাত আদায় করেন, তবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশে কোনো চরম দরিদ্র মানুষ অবশিষ্ট থাকবে না। উদাহরণস্বরূপ, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো সুসংগঠিত যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।

যাকাত কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। দেশে ইসলামের এই অর্থনৈতিক বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দারিদ্র্য একটি ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন এবং চ্যানেল কর্ণফুলী ও সিটিজি টাইমস

ক্যাটাগরি