সোমবার, ২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয়

রাজনৈতিক দল ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে পরিণত হচ্ছে

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্য পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনে একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কোনো কোনো প্রার্থীর ব্যয় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলে মনোনয়ন বাণিজ্যের চর্চা রয়েছে। তবে দলগুলো প্রকাশ্যে এ ধরনের বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে। শুধু মনোনয়ন বাণিজ্য নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব নির্বাচন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও ব্যাপক ঘাটতি পেয়েছে টিআইবি। গবেষণায় ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিএনপির মতো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করেনি। দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের প্রভাব, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় পদে আসীন হওয়ার সুযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

মনোনয়ন বাণিজ্য বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন। অথচ নির্বাচন কমিশনে পুরো দল মিলে বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধান আর্থিক অস্বচ্ছতারই পরিচায়ক। এর ফলে পর্দার আড়ালে বা টেবিলের নিচে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং অবৈধ অর্থায়নের পথ সুগম হচ্ছে।

টিআইবির গবেষণা জানাচ্ছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১০টিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমাণ রয়েছে।

এসব দল হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি রাজনৈতিক দলের জাতীয় সম্মেলন নিয়মিত হয় না। একটি প্রধান রাজনৈতিক দল ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কাউন্সিল আয়োজন করেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গবেষকরা জানান, দলটি বিএনপি। এ ছাড়া দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তৃণমূলের অংশগ্রহণও সীমিত।

দলীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়। কোনো দলেরই সুস্পষ্ট আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালী নেই। দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। আয়-ব্যয়ের বড় অংশ কর্মসূচিভিত্তিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। গঠনতন্ত্রে সদস্যদের চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, আর্থিক লেনদেন, ফরম ফি, নিরীক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে।

১৩ বছরে সহিংসতায় নিহত ৭৪৬ : রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ঘাটতির অন্যতম পরিণতি হিসেবে রাজনৈতিক সহিংসতাকে চিহ্নিত করে টিআইবির পর্যবেক্ষণ, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ বছর আট মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার চার হাজার ২৮০টি ঘটনায় অন্তত ৭৪৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫১ জন। গবেষণায় জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে ৪২৮ জন নিহত এবং ২৭ হাজার ৮৬০ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের এক হাজার ৯২৬টি ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩১৮ জন এবং আহত হয়েছে ১৮ হাজার ৪৯১ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট নিহতের প্রায় ৪২ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে নিজ দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে।

এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের। এ ছাড়া জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদেরও বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪৬ জন নিহত এবং তিন হাজার ৫৯ জন আহত হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ অতি মাত্রায় অর্থনির্ভর হওয়ায় দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক অর্থায়নের এই ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার ফলে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে, যা রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে পরিণত করছে।’

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে এ ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে, এমনকি মানুষের প্রাণহানিও ঘটছে। জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় স্থানীয় পর্যায়ে এই প্রবণতা আরো বেশি বিকশিত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। জবাবদিহির ঘাটতির কারণে বড় দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য দেশের চর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য রয়েছে।

দলগুলোর নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের প্রাধান্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূল, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠী ও নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে নেতৃত্ব বিকাশে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য এটি ইতিবাচক নয়।

গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গবেষণাটি ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই পর্যায়ে পরিচালিত হয়। এতে মোট ৩২টি রাজনৈতিক দলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ক্যাটাগরি