সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

লামায় জব্দ ১২ ড্রেজারের নিলাম স্থগিত”‘সোহেলের বাড়িতে একটি মেশিন, মালিকানা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য’

লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালু সন্ত্রাস লামা উপজেলার জন্য নতুন বিষফোঁড়ায় রূপ নিয়েছে। উপজেলার একটি পৌরসভা ও তিনটি ইউনিয়নের দুই শতাধিক পয়েন্টে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে গত কয়েক মাসে উপজেলা প্রশাসন একাধিক মোবাইল কোর্ট ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ১২টি ড্রেজার মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

জব্দ করা ড্রেজার মেশিনগুলো সরকারি বিধি অনুযায়ী উন্মুক্ত নিলামে বিক্রির জন্য সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা সময় নির্ধারণ করে উপজেলা প্রশাসন। নির্ধারিত সময়ে স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪৩ জন ব্যবসায়ী নিলামে অংশ নেন। তবে উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সরকারি মূল্য না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ড্রেজার মেশিনগুলোর নিলাম সম্পন্ন হয়নি।
নিলামে অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, মোবাইল কোর্টে জব্দ করা ড্রেজারগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থায় থাকা একটি মেশিন নিলামস্থলে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের দাবি, নিলামস্থলে থাকা কয়েকটি মেশিন নষ্ট ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ নিয়ে নিলামস্থলে প্রশ্ন ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

নিলামে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কিছুদিন আগেও ভালো অবস্থার মেশিনগুলো নিলামস্থলে ছিল। পরে একটি ভালো ড্রেজার মেশিন উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক মো. সোহেলের বাড়িতে রয়েছে বলে তারা জানতে পারেন।

আরেক ব্যবসায়ী মো. আইয়ুব বলেন, নিলামস্থলে থাকা নষ্ট ও জরাজীর্ণ মেশিনগুলোর দাম প্রায় চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এসব মেশিনের প্রকৃত বাজারমূল্য দুই লাখ টাকাও হবে না বলে দাবি করেন তিনি। ভালো মেশিনগুলো কোথায়—এমন প্রশ্ন তোলার পর নিলামস্থলে হট্টগোল সৃষ্টি হয় বলেও জানান তিনি।

পরে কয়েকজন ব্যবসায়ী খোঁজ করতে গিয়ে উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক মো. সোহেলের বাড়িতে একটি ড্রেজার মেশিন দেখতে পান বলে দাবি করেন। সোহেলের বাড়িটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় বলে জানান তারা।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, মোবাইল কোর্টে জব্দ করা সরকারি সম্পদ হলে সেটি একজন অফিস সহায়কের বাড়িতে কীভাবে গেল? তবে মেশিনটি যে প্রশাসনের জব্দ করা মেশিন, তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে অফিস সহায়ক মো. সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার ছোট ভাই মিজান জনৈক রুবেলের কাছ থেকে দুই বছর আগে কিনে নিয়েছে। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”এরপর মেশিনটির মালিকানা বিষয়ে সোহেলের ছোট ভাই মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বলেন, “দুই বছর আগে এইটা জনৈক রুবেলের কাছ থেকে কিনেছি।”তবে মিজানের বক্তব্য যাচাই করতে কথিত বিক্রেতা রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভিন্ন কথা বলেন। রুবেল বলেন, “আমি কি মেশিনের ব্যবসা করি নাকি? আমি কিছুই জানি না এবং মেশিনও বিক্রি করি নাই।”

ফলে একটি ড্রেজার মেশিনের মালিকানা নিয়ে সোহেল, তার ভাই মিজান ও কথিত বিক্রেতা রুবেলের বক্তব্যে দেখা দিয়েছে অসঙ্গতি। এখন প্রশ্ন উঠছে—মেশিনটি যদি দুই বছর আগে রুবেলের কাছ থেকে কেনা হয়ে থাকে, তাহলে সেই ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো দলিল, রসিদ কিংবা লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে কি না।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিলামে অংশ নেওয়া এক ব্যবসায়ী আরও অভিযোগ করেন, কয়েক মাস আগে জব্দ করা ড্রেজার মেশিনের একটি নিলামেও ভালো একটি মেশিন রেখে দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, ওই মেশিন দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে জেনারেটর তৈরি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে তিনি কোনো নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, একই ধরনের ড্রেজার মেশিন অনেক থাকতে পারে। সোহেলের বাড়িতে থাকা মেশিনটি উপজেলা প্রশাসনের জব্দ করা মেশিন—এমনটি কীভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার দাবি, একটি অসাধু সিন্ডিকেট সরকারি কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ইস্যু তৈরি করছে।

তবে নিলামে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ বা বিতর্ক না রাখতে প্রশাসনের উচিত জব্দ করা ড্রেজারগুলোর তালিকা, মেশিনের ইঞ্জিন নম্বর, সিরিয়াল নম্বর, মডেল ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য যাচাই করা। এতে সোহেলের বাড়িতে থাকা মেশিনটি জব্দ করা ১২টি ড্রেজারের কোনো একটি কি না, তা সহজেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে নির্ধারিত সরকারি মূল্য না পাওয়ায় সোমবারের নিলাম সম্পন্ন না হওয়ায় জব্দ করা ড্রেজারগুলোর পরবর্তী নিলাম কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযানে জব্দ করা সরকারি সম্পদ নিলামের আগেই কোথাও সরানো হয়েছে কি না, সোহেলের বাড়িতে থাকা ড্রেজারটির প্রকৃত মালিক কে এবং মিজানের কথিত ক্রয়-বিক্রয়ের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে প্রশাসনের জব্দ তালিকা ও মেশিনের শনাক্তকারী তথ্য যাচাইয়ের ওপর।

ক্যাটাগরি