অধ্যায়বসান: শৈশবের কঠিন লড়াই থেকে বিশ্বজয়ের মহাকাব্য, ফিরে দেখা লিওনেল মেসির রঙিন ক্যারিয়ার
হাবিবুর রশিদ হিমন:
ফুটবলের নীল-সাদা ক্যানভাসে আঁকা সেই জাদুকরী অধ্যায়ের অবশেষে সমাপ্তি ঘটল। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোলের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান আর ঝুলিতে বিশ্বজয়ের ট্রফি নিয়ে জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেন এই ফুটবল মহাতারকা।
রোসারিওর অলিগলি থেকে ফুটবল বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠার মেসির এই পথচলা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। একনজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁর ফুটবলের জীবনের দীর্ঘ ও রঙিন পথচলা:
লড়াই দিয়ে শুরু: হরমোনজনিত সমস্যা ও বার্সেলোনায় আগমন
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিওতে জন্ম নেন লিওনেল অ্যান্ড্রেস মেসি। শৈশবেই তাঁর প্রতিভা নজর কেড়েছিল সবার। তবে ১০ বছর বয়সে শরীরে ‘গ্রোথ হরমোন’জনিত জটিলতা ধরা পড়লে থমকে যায় তাঁর ক্যারিয়ার। চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে অপারগ ছিল স্থানীয় ক্লাবগুলো।
অবশেষে ২০০০ সালে তাঁর পাশে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। ক্লাবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর চার্লস রেক্সাখ একটি টিস্যু পেপারে মেসির সঙ্গে চুক্তির মুসাবিদা করেন এবং চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেন। এর মাধ্যমেই শুরু হয় এক সোনালী যুগের।
বার্সেলোনা সাম্রাজ্য ও রেকর্ডের পাহাড়
বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমি থেকে উঠে এসে ২০০৪ সালে মূল দলে অভিষেক হয় মেসির। এরপরের ১৭ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে তিনি জেতেন ১০টি লা লিগা ও ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ সহ মোট ৩৫টি ট্রফি।
৯১ গোলের বিশ্বরেকর্ড: ২০১২ পঞ্জিকাবর্ষে সর্বমোট ৯১টি গোল করে এক বছরে সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি।
এক ক্লাবে সর্বোচ্চ গোল: বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করে এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেন।
পরে ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে ফরাসি ক্লাব পিএসজি এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়ে ক্লাব ফুটবলে নতুন জোয়ার নিয়ে আসেন।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: কান্না থেকে রক্তিম হাসি
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে, যেখানে অভিষেকের মাত্র ৪৪ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে সোনা জিতলেও জাতীয় দলের মূল ট্রফির জন্য তাঁকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
হতাশার মেঘ (২০১৪–২০১৬): ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা পরাজয়ের পর চরম হতাশায় ২০১৬ সালে সাময়িক অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে ভক্তদের ভালোবাসায় দ্রুতই মাঠে ফেরেন।
স্বর্গের ছোঁয়া (২০২১–২০২৪): ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফিখরা কাটান মেসি। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপে দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে ফুটবলকে দেন পূর্ণতা। ২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা জিতে নিজের ট্রফি ক্যাবিনেট আরও সমৃদ্ধ করেন।
মহাকাব্যের শেষ পাতা
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তোলার পর এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে জাতীয় দলকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি।
মাঠের খেলা থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই জাদুকরের বিদায়ে কেঁদেছে ফুটবল বিশ্ব। তবে তাঁর রেখে যাওয়া রেকর্ড, খেলায় তাঁর নান্দনিক শৈলী এবং জাদুকরী স্পর্শ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে চিরকাল