শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

পাথর খেকোদের থাবায় মরছে রুমার নদী-ঝিড়ি: প্রতিবাদ করলেই মিলছে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা!

পাহাড়ের উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের আড়ালে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বান্দরবানের রুমা উপজেলার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র বাধা এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি উপেক্ষা করে বড়মদক এলাকার নদী ও ঝিড়ি থেকে চলছে অবাধে পাথর উত্তোলন। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো স্থানীয় নিরীহ এলাকাবাসীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উন্নয়ন কাজের দোহাই দিয়ে চলা এই অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের কারণে পাহাড়ি জনপদের পানির মূল উৎসগুলো শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার সামগ্রিক পরিবেশ ও জনজীবন।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম বড়মদক এলাকার ম্রক্ষ্যং ঝিড়ি, বড়মদক ঝিড়ি এবং ভিতরপাড়া সংলগ্ন ঝিড়ি ও নদীগুলো থেকেই মূলত এই পাথর তোলা হচ্ছে। পাহাড়ের নদী ও ঝিড়ি কেবল পাথর বা বালুর আধার নয়; এগুলো পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনরেখা। সুপেয় পানির সংকট থেকে শুরু করে স্থানীয় জীবনযাত্রা, মৎস্য সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের সম্পূর্ণ ভারসাম্য নির্ভর করে এই প্রাকৃতিক ঝিড়িগুলোর ওপর। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের পরিবেশগত সমীক্ষা বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভারী যন্ত্রপাতি ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে এবং পাহাড়ের ঢালগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক ভূমিধসের ঝুঁকি।

প্রকৃতি রক্ষায় যখনই স্থানীয় সাধারণ মানুষ এক হয়ে পাথর উত্তোলনে বাধা দিতে গেছেন, তখনই তাদের বিরুদ্ধে নানা হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, পাথর খেকো সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো প্রতিবাদী সাধারণ মানুষকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে দমনপীড়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পাহাড়ি জনপদের সাধারণ মানুষ।

এ বিষয়ে রেমাক্রি ইউপি চেয়ারম্যান মুই সৈ থুই মারমা বলেন, পাথর উত্তোলনের বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তবে নদী বা ঝিরি থেকে পাথর উত্তোলন না করতে বলা হয়েছিল স্থানীয়দের। অন্যদিকে, এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। আর বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান বলেন, পাথর উত্তোলনের বিষয়ে এর আগে কোনো প্রকার অভিযোগ পাননি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উন্নয়নের পক্ষে থাকলেও পাহাড়ের মানুষ কোনোভাবেই প্রকৃতি ও মানুষের জীবন বিপন্ন করে এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড মেনে নিতে নারাজ। এলাকাবাসী ও পরিবেশ সচেতন মহলের জোরালো দাবি—বড়মদক ও ম্রক্ষ্যং ঝিরিসহ রুমার সমস্ত জলপ্রবাহ ও নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, স্থানীয়দের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে হয়রানির অভিযোগগুলোর একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে এবং পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। “উন্নয়ন হোক মানুষের কল্যাণে, প্রকৃতি ও জীবনকে বিপন্ন করে নয়”—এই বার্তা সামনে রেখে রুমার ঝিড়িগুলোকে বাঁচাতে এখন জরুরি ও কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ক্যাটাগরি