মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১১ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রকমারী

ক্ষমা ও পরোপকার মুমিনের অনন্য গুণ

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন ও চলাফেরায় কখনো কখনো একে অন্যকে মনে কষ্ট দিয়ে বসে, এই জমিয়ে রাখা কষ্টগুলো এক সময় বিরোধে রূপ নেয়। এসব পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়া এবং নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবা মহত্ চরিত্রের পরিচায়ক। ইসলাম মানুষের মধ্যে এই দুটি গুণ বিকশিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ক্ষমাশীলতা এবং পরোপকারকে মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ক্ষমা মহত্ত্বের পরিচায়ক : মানুষের স্বভাব হলো, কেউ কষ্ট দিলে তার প্রতিদান দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু প্রকৃত মহত্ত্ব প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্যের মধ্যে নয়; বরং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যে। ইসলাম অন্যায়ের প্রতিকার গ্রহণের অধিকার অস্বীকার করেনি; তবে ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ থাকলে তা গ্রহণ করতে উত্সাহিত করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অসচ্ছলতায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত:১৩৪)

আয়াতটিতে ক্রোধ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করার পর আল্লাহর ভালোবাসার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে।’ (সুরা: আশ-শুরা, আয়াত : ৪০)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ক্ষমার মহত্ত্ব কেবল কাউকে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি ও সংশোধনের পথ তৈরি হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রাগের সময় ধৈর্য ধারণ করতে এবং অন্যের দুর্ব্যবহারের সময় সহনশীলতা ও ক্ষমা প্রদর্শন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (তাফসিরে ইবনে জারির তবারি : ২১/৪৭১)

সাধারণত মানুষ মনে করে, ক্ষমা করলে নিজের সম্মান কমে যায়। অথচ নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহ ক্ষমা করার কারণে কোনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করেন না। (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)

তাই পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্বের টানাপোড়েন কিংবা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলের জন্য প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ক্ষমাশীল হওয়া উচিত।

পরোপকার মুমিনের পরিচয়: পরোপকার অর্থ অন্যের কল্যাণে কাজ করা, বিপদে সহযোগিতা করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা। এটি শুধু অর্থসম্পদ দান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারও দুঃখ মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসহায়কে পথ দেখানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোও পরোপকারের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তাআলা আনসার সাহাবিদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৯)

এ আয়াত পরোপকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল সাহাবিদের চরিত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। তাঁদের এ গুণ মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তি তৈরি করেছিল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৩)

এ হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক। একজন মুমিন নিজের জন্য সম্মান, নিরাপত্তা, স্বস্তি ও কল্যাণ কামনা করলে অন্যের জন্যও তা কামনা করবে। নিজের জন্য যে আচরণ পছন্দ করে না, অন্যের সঙ্গেও সে আচরণ করবে না। এ মানসিকতা গড়ে উঠলে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা কমে আসবে।

পরোপকারের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার সহযোগিতায় থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

অতএব, মানুষের উপকার করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং এটা আল্লাহর সাহায্য ও সন্তুষ্টি লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ক্ষমা ও পরোপকারের সমন্বয়ে সুন্দর সমাজ : ক্ষমা মানুষের অন্তর থেকে প্রতিহিংসা দূর করে, আর পরোপকার দূর করে স্বার্থপরতা। একটি মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রকে সুন্দর করে, অন্যটি সমাজে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে। এ দুটি গুণ একত্র হলে পরিবারে শান্তি, প্রতিবেশীদের মধ্যে সৌহার্দ্য এবং সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো তা দিয়ে, যা উত্তম। ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করে, তার মূর্খতার মোকাবিলা তোমার সহনশীলতা দিয়ে করো। (তাফসিরে কুরতুবি : ১৫/৩৬১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪১)

এই হাদিস মানুষসহ সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। তাই মুমিনের আচরণে কঠোরতা, অহংকার ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে দয়া, ক্ষমা ও কল্যাণকামিতা প্রকাশ পাওয়া উচিত। এর মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠবে ইনশাআল্লাহ!

ক্যাটাগরি