চট্টগ্রাম, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ , ২রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ে সোনালী ধান, খুশির বন্যা জুমিয়াদের ঘরে

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর, ২০২১ ১:৩৯ : অপরাহ্ণ

খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ে এবার জুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন চলছে ধান কাটার উৎসব। ধান ছাড়াও চাষ হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবজি। ফলন ভালো হওয়ায় চাষিরা এখন ব্যস্ত জুম খেত থেকে ফসল ঘরে তোলায়। চলছে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিও। তবে চাষের জন্য সার-বীজের পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রণোদনা চান জুমিয়ারা। আর মাটি ক্ষয় না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার পরামর্শ কৃষি বিভাগের।

পাহাড়ের কোলজুড়ে জুমের ধান। সঙ্গে রয়েছে ভুট্টা, ঢেঁড়স, কুমড়াসহ প্রায় ৪০ জাতের সবজি। প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিবর্ণ পাহাড়গুলো ফসলে ফসলে সবুজ হয়ে উঠছে। কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি আর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার জুমের আবাদ ও ফলন ভাল হয়। পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে পাকা সোনালী ধান জুমিয়াদের এনে দিয়েছে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য। ঘরে ঘরে এখন খুশির বন্যা।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও স্থানীয় জুম চাষিদের সাথে কথা বলে এ খবর জানা গেছে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এখন সময় কাটছে ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। পাহাড়ের গায়ে লাগানো ধান, মরিচ, মারফা, ভুট্টাসহ নানা ফসল বেড়ে উঠছে এখন। আর ফসলের পরিচর্যায় পরিবারের ছোট থেকে বড় সকলেই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করছে। আর দুপুরে বিশ্রামের জন্য পাহাড়ের গায়ে পাহাড়িরা তৈরি করছে অস্থায়ী জুম ঘর। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে জুম চাষের মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১৯ হাজার ৮৬২ হেক্টর জমিতে ৪০ হাজার জুমিয়া পরিবার জুম চাষ করছে। এ মধ্যে সবচেয়ে বেশী জুমের আবাদ হয়েছে বান্দরবান পার্বত্য জেলায়।

বান্দরবানে ২৮ হাজার পরিবার প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ করেছে। রাঙ্গামাটিতে ৫ হাজার পরিবার সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে এবং খাগড়াছড়িতে ৬ হাজার ৬৮২ পরিবার ৫ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে আবাদ করেছে। পার্বত্য অঞ্চলে লাঙ্গলে চাষাবাদ জমির পরিমাণ খুবই কম। ফলে পাহাড়িরা জীবন ধারণের একমাত্র উপায় পাহাড়ে আদিযুগের প্রথানুযায়ী জুম চাষের ফসল উৎপাদন করে থাকে। সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে মালিকানাধীন কিংবা পরিত্যক্ত ঘন বন-জঙ্গল, পাহাড় নির্বাচন করে জঙ্গল কাটা শুরু হয় এবং ফাল্গুন-চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রখর রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়ে ছাই করা হয়। পাহাড়ে বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে প্রথম বীজ ধান রোপণ ও পরবর্তীতে বিভিন্ন সবজির বীজ রোপণ করা হয়।

বর্তমানে জুম চাষের উৎপাদিত ফসলের মধ্যে রয়েছে- মারপা (শসা জাতীয়) বরবটি, শিম, বেগুন, চিকন মরিচ, ধনিয়া, কুমড়া, ঢেঁড়স, বাতিমা, কচুসহ নানা প্রকার শীতকালীন সবজি। এ সমস্ত সবজি পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিটি হাটবাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিটি হাটের দিনে বিভিন্ন জেলার কাঁচামালের ব্যবসায়ীরা পাইকারি হারে তা ক্রয় করে ট্রাকভর্তি করে চালান করছে সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলে। জুম সবজির মধ্যে জুম মিষ্টি কুমড়া ও সাদা কুমড়া সুস্বাদু বলে সব এলাকায় প্রিয়।

জুম উৎপাদিত সবজিগুলো তুলনামূলক ভাবে অন্যান্য সবজির চেয়ে কম মূল্য এবং ক্রেতার সংখ্যা বেশি বলে জানা গেছে। এবার এই দেশের অন্যান্য জেলায় সবজির দাম বেশি হওয়ায় জুম চাষিরা তাদের উৎপাদিত ফসল পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বেশ ভাল দামে বিক্রি করতে পারছে।

অন্যান্য বছর যেখানে জুম চাষিরা প্রতি কেজি মারফা (শসা জাতীয়) ফল ১০ টাকা ১২ টাকা দামে বিক্রি করতেন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দামে। সবজির ন্যায্য মূল্য পেয়ে চাষিরা আনন্দিত।

জুম চাষি খগেন্দ্র ও হরি ত্রিপুরা জানান, এবার প্রথম থেকে আবহাওয়া ছিল অনুকূলে। চৈত্র বৈশাখ মাসে জুমের গুল্ম লতা পুড়ে ফেলার জন্য ছিল প্রখর রোদ। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে ধানসহ বিভিন্ন ফলের চারা গজিয়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টি ছিল। ব্যাপক হারে ভূমি ধসের আশঙ্কা থাকলেও ভূমি ধস কম হওয়ায় কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে। ফলে এবার জুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। খাগড়াছড়ি শহরের আলুটিলা, দীঘিনালা সড়কের বিভিন্ন স্থানে জুমে উৎপাদিত পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে।

বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে জুমে নতুন জাতের ধান রোপণ ও পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট আউশ মৌসুমের বিরি- ২৪, বিরি ২৬, বিরি ২৭ সহ গবেষণায় পরীক্ষাধীন দুইটি জাতের ধান জুমে পরীক্ষামূলকভাবে খাগড়াছড়িতে আবাদ করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মর্ত্তুজ আলী জানান, প্রদর্শনী প্লটে জুমের আবাদ ভাল হয়েছে। চারটি জাতের মধ্যে বিরি ২৪ ও বিরি ২৭ এর ফলন সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে তিনি জানান।

খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুন্সি রশিদ আহমেদ জানান, বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে এখন ভালো ফলন পাচ্ছে কৃষক। কারণ দিনদিন পাহাড়ের মাটি ক্ষয় ও উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণে জুম পাহাড়ে বাড়ছে সারের ব্যবহার। আগে এক পাহাড়ে দীর্ঘ বছর পরপর জুম চাষ হলেও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জুম পাহাড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন একই পাহাড়ে প্রতি বছর জুম চাষ করা হচ্ছে। তবে জুম চাষের আধুনিক পদ্ধতি পাল্টে দিয়েছে চাষাবাদের ধরন। এই পদ্ধতিতে পরিমিত সার ব্যবহার করে প্রতি বছর একই জমিতে বারবার ফসল উৎপাদন করতে পারবে।

জুম চাষের উপর নেতিবাচক ধারণা থাকলেও পার্বত্য অঞ্চলের বড় ছোট প্রায় ১৪টি বিভিন্ন ভাষাভাষির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন সাধারণত এ জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায় জুমে উৎপাদিত প্রত্যেকটি ফসল সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য গৌতম কুমার চাক্মার ১৯৮৮ সালে লেখা এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ১ লাখ পরিবার জুম চাষ করে।
অপরদিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫টি প্রধান জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুরং ৮৪.০৪ ত্রিপুরা ৫৪.০৮, মারমা ৪২.৩, চাক্মা ২০.০৭, এবং ১.০৬% বাঙ্গালি জুম চাষ করেন। চাক্মা সম্প্রদায় ঝুম, ত্রিপুরা ভাষায় ছুগ এবং মারমা ভাষায় ইয়া নামে পাহাড়ে জুম চাষ হয়ে থাকে।

 

Print Friendly and PDF