চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা: তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে আজ

প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ৯:৫৫ : পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন জমা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি।

গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কক্সবাজার হিলডাউন সার্কিট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেজন্য ৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১২টি সুপারিশ রাখা হয়েছে।

চার দফা সময় বাড়িয়ে ৩৫ দিনের মাথায় তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার কথা জানিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে গেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এ প্রতিবেদনটি প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য করণীয় সম্পর্কে একটি সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। দু’টিই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ৬৮ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের বক্তব্য নেয়া হয়েছে। এসব কথা-বক্তব্য এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে কমিটির সব সদস্য সর্বসম্মতভাবে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে। সিনহা হত্যার ঘটনাটি কেন ঘটেছে এবং এ ঘটনায় কারা দায়ী তা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।

খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডাকাত আসার তথ্য সঠিকভাবে ভেরিফাই (যাচাই) না করেই অভিযান শুরু করা হয়। অভিযান শুরুর আগে অতিরিক্ত ফোর্স নেয়া হয়নি।

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়ে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত শুধু কৃতিত্ব পাওয়ার আশায় গুলিবর্ষণের মতো হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিনা সেটা ফৌজদারি তদন্তে বের করে আনতে হবে। নিছক আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছিলেন কিনা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা তাও ফৌজদারি তদন্ত করে বের করতে হবে।

মেজর (অব.) সিনহা গাড়ি থেকে নামার সময় অস্ত্র নিয়ে নেমেছিলেন নাকি পুলিশ সদস্যরা তার হাতে অস্ত্র দিয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি প্রতিবেদনে। বলা হয়, এ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকায় তা ফৌজদারি তদন্তে বের করতে হবে। পাহাড়ে ডাকাত উঠেছে বলে গ্রামের লোকদের মাইকিং এবং পুলিশকে ডাকাতের তথ্য দেয়ার বিষয়েও স্পষ্ট করে তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু বলা হচ্ছে না। এ বিষয়ে বলা হচ্ছে- এলাকাবাসী কি ভুলক্রমে পুলিশকে খবর দিয়েছিল নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল তা ফৌজদারি তদন্ত ছাড়া বের করা সম্ভব নয়।

সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে প্রতিবেদনের খসড়ায় বলা হয়, সিনহার গাড়ি থেকে উদ্ধার করা ইয়াবা ও গাঁজা পুলিশ পরিকল্পিতভাবে দিয়েছিল। এ বিষয়ে সিনহার সহযোগী সিফাতের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এত গাঁজা গাড়িতে থাকার কথা নয়।

ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার ও একাধিক সাক্ষীর বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, ঘটনার পর মেজর সিনহার গলায় পা দিয়ে চাপ দেয়া হয়েছে। এতে গলায় দাগ পড়ে গেছে। তবে সিনহার গলায় কে পা দিয়ে চাপ দিয়েছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত কমিটি।

ঘটনার পর সিনহাকে কেন দেরি করে হাসপাতালে পাঠানো হল? এটা ইচ্ছাকৃত কিনা তা ফৌজদারি তদন্তে বের করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। গাড়ি পেতে দেরি হওয়ার কারণে সিনহাকে হাসপাতালে নিতে দেরি হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুপারিমালায় আরও আছে, ঘটনার ক্রাইম সিন সংরক্ষণে আরও সতর্ক হওয়ার জন্য জেলা পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা বেশি হওয়াতে ছোটখাটো ঘটনাতে অস্ত্র ব্যবহারে বাহিনীর সদস্যরা অতিমাত্রায় সংবেদনশীল থাকেন। এটা বন্ধ করতে হবে। গুলিবর্ষণের নির্বাহী তদন্তের সময় নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা কি থাকে তা তদন্ত করতে হবে বলে প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হচ্ছে।

তথ্য মতে, গত ৩১ আগস্ট টেকনাফের বাহারছড়ায় পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় গত ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাজাহান আলীকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এতে সদস্য করা হয়েছিল কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন এবং সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধিকে। কিন্তু এর পরদিনই (৩ আগস্ট) তদন্ত কমিটি চার সদস্য বিশিষ্ট করে পুনর্গঠন করা হয়। এতে কমিটির প্রধান করা হয় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে।

আর সদস্য করা হয় কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাজাহান আলী, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. জাকির হোসেন এবং সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডারের প্রতিনিধি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাজ্জাদকে।

গত ৩ আগস্ট তদন্ত কমিটি আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করেছিল। এসময় কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য সরকার সাত কর্মদিবস সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও এ নিয়ে তিন দফায় সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু এরমধ্যে বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিতে আরো সাতদিনের সময় চায় এবং তা বাড়ানো হয় ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। গত ৩ সেপ্টেম্বর ওসি প্রদীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত দল।

টেকনাফে সিনহা নিহত হওয়ার পরপরই পুলিশ বাদী হয়ে সিনহা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করে। ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন মেজর সিনহার বড়বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এ মামলায় ৭ পুলিশ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এছাড়া হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে র‌্যাব আরো ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে তিনজন হলেন পুলিশের করা মামলার সাক্ষী। অন্য তিনজন হলেন এপিবিএনের সদস্য। গ্রেপ্তারকৃত প্রত্যেককেই র‌্যাব হেফাজতে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। এ সংক্রান্ত সব মামলা এখন তদন্ত করছে র‌্যাব।

এরই মধ্যে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী এবং এসআই নন্দ দুলালসহ ৮ জন ফৌজদারি কর্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা এখন কারাগারে আছেন। জবানবন্দি না দিলেও একাধিক দফায় রিমান্ড শেষে কারাগারে আছেন টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাকি চার আসামি এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল- সাফানুল করিম, কামাল হোসেন এবং আবদুল্লাহ আল মামুনকে ফের ৪ দিনের রিমান্ডে নেয় র‌্যাব।

Print Friendly and PDF

———