চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০ , ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মৌন প্রতিবাদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা দিবস পালিত

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট, ২০২০ ১০:৩৯ : অপরাহ্ণ

আমান উল্লাহ কবির, টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

ঘরে আবদ্ধ ও মসজিদ মক্তবে অবস্থান করেছিলেন রোহিঙ্গারা। যা এক ধরণের মৌন প্রতিবাদ। এভাবেই গণহত্যা দিবস পালন করেছে রোহিঙ্গারা। কোনো ধরণের কার্যক্রম ছাড়া নিরবতার মাধ্যমে গণহত্যা দিবস পালন করেছে।

রোহিঙ্গা আগমনের ৩ বছর ছিল মঙ্গলবার। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ভোরে মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদর ওপর গণহারে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করেছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেনা সমর্থিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। এর ফলে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিজেদের দেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আর আগেই দেশটি থেকে আরও চার লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। এসব রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের আওতায় আনায় তারা বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। এছাড়াও বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড বা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন দশ হাজারের মতো রোহিঙ্গা।

খোঁজ খবর ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,২০১৮ সালে এ দিবসটি স্মরণে রোহিঙ্গারা শুধু দোয়া প্রার্থনা করলেও ২০১৯ সালে মসজিদে মসজিদে দোয়ার পাশাপাশি বিনা অনুমতিতে ব্যানার ফেস্টুন, টি শার্ট ইত্যাদি পড়ে বড় আকারে সমাবেশ আয়োজন করে এআরএসপিএসসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা সংগঠন।

লাখ লাখ রোহিঙ্গা ওই সমাবেশকে দেশের আইনশৃঙ্খলা সহ সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখে সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) সহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে ও ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) ও একাধিক এনজিও প্রত্যাহার করে নেয় এবং রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে আরও কঠোর নজরদারিতে আনা হয়।

এরই প্রেক্ষিতে আজকে (২৫ আগস্ট) তারা কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। তবে এ দিনটি তারা ঠিকই স্মরণ করেছে। সকাল থেকে নিত্যদিনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। অন্যান্য দিনের মতো হইহুল্লুর নেই বললেই চলে। মসজিদ-মক্তব ও খালি জায়গা এবং বাড়িতে দোয়া প্রার্থনায় মশগুল ছিলেন। বেশিরভাগ রোহিঙ্গা সকাল থেকে বাড়ি ঘর থেকে বের হননি। কিছু কিছু দোকানপাট বন্ধ ছিল। যারা এনজিও দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো, তারাও অনেকে কোনো কার্জ কর্মে যোগদান করেননি। বেলা পড়ার সাথে সাথে রোহিঙ্গারা তাদের ছোট ছোট ঘর থেকে বের হতে থাকে।

রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, বড় পরিসরে করতে না পারলেও মৌনতার মাধ্যমে তারা ঠিকই গণহত্যা দিবস ও সেই দিনের নির্যাতনের প্রতিবাদ করা হয়েছে। করোনা সহ নানা কারণে তারা এবারে গণহত্যা দিবস পালন করতে অনুমোদন চাওয়া হয়নি। তবে কর্ম বিরতির মাধ্যমে ও ঘুরে ফেরা না করে বাড়িতে এবং মসজিদে বসে দিনটিকে স্মরণ করা হয়। ওই দিন থেকে মিয়ানমার সেনা বাহিনী ও পুলিশ রোহিঙ্গাদের উপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে, গণহত্যা করা হয় তাদের জন্য দোয়া করা হয়েছে। মসজিদে মক্তবে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়েছে। পাশাপাশি ছেলে মেয়েদেরকে বিষয়টি সঠিকভাবে জানানো হয়।

এ দিকে উখিয়ার একটি ক্যাম্পে ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভোর হওয়ার সাথে সাথে কিছু রোহিঙ্গা শতাধিক মাস্ক মাটিতে মাস্ক গেড়ে মৌন প্রতিবাদ করা হয়। এতে তারা বুঝিয়েছেন, করোনার জন্য জমায়েত হয়ে দিবসটি পালন করা যায়নি।

এ ছাড়া উখিয়ার কিছু কিছু ক্যাম্পে কতিপয় রোহিঙ্গারা ব্যানার ফেষ্টুন মজুদ রেখেছিল। সময় ও সুযোগের অভাবে তারা মানববন্ধন সহ মিছিল সমাবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা নেতা বজরুল ইসলাম ও ক্যাম্প চেয়ারম্যান রমিদা জানিয়েছেন, করোনা সহ নানা কারণে গেলো দুই বছরের মতো গণহত্যা দিবস পালন করতে পারিনি। এবারে আমরা সকাল থেকে সেচ্ছায় ঘরবন্ধি ছিলাম। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের দিনকে স্মরণ করেছি। দুপুরের নামাজে প্রায় মসজিদে দোয়া ও কান্নাকাটি করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘরোয়া বৈঠকে চারটি বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনাগুলো হলো ১, গণহত্যার বিষয়টি অন্যান্য দেশগুলো (ভেটুকান্ট্রি) প্রচার করছেনা; ২ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বড় দেশগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা; ৩ আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি; ৪ রোহিঙ্গাদের ছেলে মেয়েরা লেখা পড়া থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এসবের দ্রুত সমাধান চান রোহিঙ্গা নেতারা।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন প্রতিটি ক্যাম্পে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরদার করা হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ এপিবিএনের সদস্যরা ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সকাল থেকে কাজ করেছে। তিনি আরো বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হয়নি। সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্কলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।

এ দিকে তৃণমূলের অসংখ্যা রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে অধীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তাদের নাগকিত্ব ও ভিটে বাড়ি ফেরতের শর্তে। তারা জানিয়েছে, ১০-১২ ফুটের ত্রিপলের চাউনিতে গাদাগাদিভাবে আর থাকতে মন চাইছেনা তাদের। দ্রুত মিয়ানমারে নিরাপত্তার মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে দাবি তাদের।

তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবস কমিশনার মাহবুবুল আলম তালুকদার জানিয়েছেন, তার কমিশন প্রস্তুত রয়েছে। মিয়ানমার চাওয়া মাত্রই রোহিঙ্গাদের ফেরত দেয়া হবে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে তিন মাসের বেশি সময়ে দলে দলে ঢল বেধে এপারে এসে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৪ শিবির গড়ে তুলে রোহিঙ্গারা। এসব শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। দু’দফা প্রত্যাবাসনের আয়োজন করেও একজন রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফেরাতে পারেনি। সর্বশেষ রাখাইনে সংঘটিত এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বলছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলছে এ মামলার বিচার। গত দু’বছর ধরে রোহিঙ্গারা ২৫ আগস্টকে ‘রোহিঙ্গা জেনোসাইড রিমেম্বার ডে’ বা ‘গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় আইসিজে ও আইসিসিসহ আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

Print Friendly and PDF

———