চট্টগ্রাম, সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২০ , ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এতো বড় ‘বাটপার’, কেউ চিনতো না?

প্রকাশ: ৮ জুলাই, ২০২০ ৫:৫৪ : অপরাহ্ণ

বেরিয়ে আসছে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদের জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। নানা নামে, নানা পরিচয়ে নিজেকে জাহির করে বিভিন্ন সময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন অর্থ, কয়েক বছরেই বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। তার বিরুদ্ধে রাজধানীতেই রয়েছে ৩২টি মামলা।

করোনা পরীক্ষা না করেই সার্টিফিকেট প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। মামলায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে প্রধান আসামি করে ১৭ জনের নাম উল্ল্যেখ করা হয়। প্রধান আসামিসহ ৯ জন আসামিকে পলাতক দেখিয়ে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আসামিরা হলেন, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ পারভেজ, রিজেন্ট হাসপাতালের কর্মী তরিকুল ইসলাম, আবদুর রশিদ খান জুয়েল, মো. শিমুল পারভেজ, দীপায়ন বসু, আইটি কর্মকর্তা মাহবুব, সৈকত, পলাশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব (১), হেলথ টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব (২), হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, অভ্যর্থনাকারী কামরুল ইসলাম, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক মো. রাকিবুল ইসলাম, রিজেন্ট গ্রুপের মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, রিজেন্ট গ্রুপের গাড়িচালক আবদুস সালাম ও নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রশিদ খান।

এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে হাসপাতালের শাখা দুটির (উত্তরা ও মিরপুর) কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশের কথা বলা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে উত্তরায় রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করে দেয় র‌্যাব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) মো. আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রিজেন্ট হাসপাতালের ওই দুই শাখায় গত মার্চ থেকে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গতকাল সোমবার র‌্যাবের অভিযানে উত্তরা শাখায় (মূল শাখা) বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে। এতে দেখা যায়, হাসপাতাল দুটি রোগীদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে বিরাট অঙ্কের টাকা আদায় করছে। পাশাপাশি অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও আরটি-পিসিআর পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ও তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ আরও অনিয়ম প্রমাণিত হয়। এসব অনিয়মের কারণে এবং ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবটোরিস রেজুলেশন অরডিনান্স-১৯৮২’ অনুযায়ী এই হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো।

মোহাম্মদ শাহেদ নামেই পরিচিতি। আসল নাম শাহেদ করিম। সাতক্ষীরার এক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান শাহেদ কয়েক বছরেই হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক ।

২০১১ সালে ধানমন্ডিতে এমএলএম ব্যবসা করে গ্রাহকদের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তখন লোকে তাকে চিনতো মেজর ইফতেখার করিম নামে। কখনো মেজর, কখনো সচিব. ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এপিএস হিসেবেও নিজের পরিচয় দিয়েছেন।

মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ থেকে ৬ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার নথিতে নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল হিসেবে জাহির করেন। এ বিষয়ে আদালতে ২টি মামলা চলছে এখনো।

শাহেদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় ২টি, বরিশালে ১টি, উত্তরা থানায় ৮টি মামলাসহ রাজধানীতে ৩২টি মামলা রয়েছে। সবগুলো মামলা ৪২০ ধারায়। ২০০৯ সালের জুলাই প্রতারণার মামলায় তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শাহেদসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রশাসন জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। বেরিয়ে এসেছে কী পরিমাণ অনিয়ম এখানে হয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান চলছে। সোমবার রাজধানীর উত্তরা এবং মিরপুরে শাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়

এই প্রতারক ব্যক্তিটি শাহেদ বা সা‌হেদ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেও তার আসল নাম কিন্তু মোঃ শাহেদ করিম, পিতা- সিরাজুল করিম, মাতা- মৃত সুফিয়া করিম। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএস‌সি। তার মা মৃত্যুবরণ করেন ৬ নভেম্বর ২০১০ সালে। প্রতারক শা‌হে‌দের একাধিক নাম রয়েছে। তিনি কখনো কখ‌নো মেজর ইফতেকার আহম্মেদ চৌধুরী, ক‌র্নেল ইফতেকার আহম্মেদ চৌধুরী, কখ‌নো মেজর শাহেদ করিম হিসেবে পরিচয় দিতেন, কিন্তু তার আসল নাম জাতীয় পরিচয়পত্রে শাহেদ করিম লেখা। কিন্তু পরে তিনি মোঃ শাহেদ নামে আরেক‌টি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করেছেন। এ জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয় ২৫-৮-২০০৮ তারিখে। কিন্তু তাতে তার মা মারা গেছেন লেখা রয়েছে, অথচ তার মা মৃত্যুবরণ করেন ৬ নভেম্বর ২০১০ তারিখে। তাতেই প্রমাণ হয় এটাও ভুয়া। ঠিকানা হরনাথ ঘোষ রোড, লালবাগ, ঢাকা-১২১১ রয়েছে। এটাও ভুয়া।এক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও প্রতারণা বাটপারি করে আজ শত শত কোটি টাকার মালিক।

জানা যায়, বিএনপি সরকারের আমলে জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সাথেও সর্ম্পক গড়ে তোলেন। তা‌র মাধ্য‌মে তা‌রেক জিয়ার হাওয়া ভব‌নে তার অবাধ যাতায়ত ছিল।

১/১১ ফকরু‌দ্দিন সরকা‌রের সময় মামুনের সাথে তিনি দুই বছর জেলও খাটেন। জেল থে‌কে বের হ‌য়ে শা‌হেদ ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নং রোডে এমএলএম কোম্পানি বিডিএস ক্লিক ওয়ান নাম বাটপারী ব্যবসা প্র‌তিষ্ঠান খু‌লে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা ক‌রে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। আর তিনি সে সময় নিজেকে মেজর ইফতেখার করিম চৌধুরী বলে পরিচয় দিতেন।

এই প্রতারক মোঃ শাহেদ ওরফে ‌মেজর/ক‌র্নেল ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী, ওরফে শাহেদ করিম, ওরফে মোঃ সাহেদ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকা‌রের বি‌ভিন্ন মন্ত্রী ও কর্তা ব্য‌ক্তি‌দের কা‌ছের লোক পরিচয় দিতেন। প্রকা‌শ্যে অনেক মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করেই মানুষকে হুমকি-ধমকি দিয়েছে। মন্ত্রীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট ছবি এ ব্যাপারে সহায়তা করেছে।

শাহেদ তার গাড়িতে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড ও সাইরেনযুক্ত হর্ন ব্যবহার করতেন। তিনি নিজেকে কখনো মেজর, ক‌র্নেল, সচিব, এমনকি তিনি নাকি ৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর এডিসি ছিলেন এমন পরিচয়ও দিতেন।

তিনি বিভিন্ন নিয়মিত টিভিতে টকশোতে আসতেন। খুব নীতিবাক্য বলতেন। প্রশ্ন ওঠেছে কোন সাংবাদিকরা তাকে আনতেন। তারা কি তাকে জানতেন না? জানা যাচ্ছে, শাহেদের সঙ্গে কয়েকজন সাংবাদিক নেতার ঘনিষ্টতা রয়েছে।

শা‌হে‌দের বেশ ক‌য়েক‌টি গাড়ি রয়েছে। জানা যায়, গাড়িগুলোর কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তার গাড়িতে ভি‌ভিআইই‌পি ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড, অবৈধ ওয়ারল্যাস আর অস্ত্রসহ তিন জন বডিগার্ড থাকার কারণে সাধারণত পুলিশ তার গাড়ি থামাবার সাহস পেতো না।

তার অফিসে সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেছেন এমন একজন ব্যক্তি জানান, শা‌হে‌দ তার অফিসে লাঠিসোটা রাখতেন। কোনো পাওনাদার টাকা চাই‌তে আসলে তাকে ভয় দেখানো হতো, টর্চার করা হতো। তার অফিসে সুন্দরী মেয়ের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন দেয়া হতো না । কেউ চাকরি ছেড়ে দিলে তার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা করে হয়রানি করা হতো।

এতো গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি বিভাগ সবাইকে ফাঁকি দিয়েছে লোকটা! তার মানে সবাইকে তিনি ম্যানেজ করেছেন।

সপ্তাহ কয়েক আগে জেকেজি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও পরীক্ষা না করে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কর্নধার আরিফুল চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জেকেজির কার্যক্রম দেখতে গেছেন, সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জেকেজি কী করে নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন পেল, সে সম্পর্কেও অধিদপ্তর মুখ খোলেনি।

Print Friendly and PDF

———