চট্টগ্রাম, রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ , ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এমন সুফলা দেশে কোন সংকট মানাবে না

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ২ মে, ২০২০ ৫:৫৬ : অপরাহ্ণ

শুরুতেই দুটি প্রশ্ন থাকুক। এখন কি বাজারে না গিয়ে চলতে পারে মানুষ? আর বছর তিরিশ আগে কিভাবে বাজারে না গিয়ে জীবন চলেছে একই দেশের মানুষের? এবার প্রশ্ন ভাঙতে সামনে পা বাড়ানো যাক।

এই আধুনিক বর্তমানে দাঁড়িয়ে বাউল গান ধরেছেন ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। কারণ মাছে-ভাতে বাঙালি কিংবা আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে কথাগুলো আবহমান বাঙালির ঘরে বহুল চর্চিত ছিল। কারণও আছে। একদা আমাদের পুকুর ভরা মাছ ছিল, গোলা ভরা ধান ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল।

রাজা বা জমিদার বাড়ি থেকে আপামর জনগণ সবার মাঝে কৃষি ছিল।

সব বাড়ি ছিল হয় গৃহস্থ৷ কিংবা কৃষিতে অভ্যস্ত। সে বাঙ্গালি এক সময় দেশ পেল-বাংলাদেশ। কৃষিপ্রধান এই দেশে দ্রুত শিল্পায়নের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। শিল্প বিপ্লবের পর বিশ্বে অর্থনৈতিক পরাশক্তির তীব্র প্রতিযোগিতার আঁচ এসে লাগলো এই সহজ সরল জনপদেও।

কৃষিপ্রধান ভূমিতে শিল্পের পা অধিক হারে পড়তে শুরু করলো। অতি নগরায়ন দৃশ্যমান হলো। আর ক্রমেই কোণঠাসা হতে শুরু করলো কৃষি। একমণ চাল উৎপাদনের চেয়ে একদিন শিল্পশ্রমে লাভের দিকে ঝুঁকল জনশক্তি। বিষয়টি আরো একটু গভীরে গিয়ে দেখে আসা যাক। একটু আমরা ঘুরে আসি অতীত থেকে। এরপর বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে যাবো।

সোনালী অতীত
আমাদের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি এমনিতেই বলেননি কবি। সুজলা সুফলা আবহমান কাল থেকে। এখানে জোর করে ফসল ফলাতে হয় না। মৌসুম বুঝে বীজ ফেললেই কেল্লাফতে। এরপর।একটি ফুড চেইন মেনটেন করতে পারলেই কিস্তিমাত।
ছোটবেলায় বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খোদার সাফল্য পড়ে বড় হওয়া আমাদের। তিনি দেখিয়েছিলেন পাঠকাঠি থেকে কিভাবে বোর্ডসহ অন্যান্য জিনিস কত সুন্দর করে তৈরি হয়। সেই পাটকে দেখি এবার। এটির বীজ বপন করলে অল্প যতনে চারা গজায়। কচি চারার পাতা সুস্বাদু ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার। বড় হলে পাটকাঠি জ্বালানি ও পাটবোর্ড ব্যবহারে কাজে আসবে। আর পাটের সেই সোনালী আঁশ তো বিশ্বজয় করেছিল এক সময়! এই আঁশ থেকে ব্যাগ, দড়ি, কাপড় থেকে নানা পরিবেশ বান্ধব দ্রব্যাদি তৈরি করা যায়। তাই এই পাট একসঙ্গে যোগান দেয় সবজি, জ্বালানি, দড়ি প্রভৃতি।

একইভাবে আরো কিছু আইটেম খতিয়ে দেখা যাক।

গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ছিল দুধ, মাংস ডিমের উৎস। গবাধি পশু আর হাঁস-মুরগি উচ্ছিষ্ট হতো ফসলের জৈব সার। এখন তো পুকুরে চাষের মাছে সয়লাব। আগে একদা ছিল কই, মাগুর, বাইন, টাকি, শোল, শিং, মলা, পুঁটি মাছের সমাহার। পোনা ফেলানোর বালাই ছিল না৷ এমনিতেই দেশি মাছে পুকুর ভরে থাকতো বছরের পর বছর। পুকুর ছাড়িয়ে তা বিল-ঝিলেও ছড়াতো। এভাবে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চালু ছিল।

বাড়ির চারপাশে ভরা ছিল সবজিতে। শিম, ঢ়েড়শ, আলু, কচু, লাউ, কুমড়ো, লেবু, আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, পেপে, লিচু, আমড়া, পেয়ারা, কূল, আতা, মেওয়া, আনারস, বাতাবিলেবু, আমলকী, হরতকী, বহেরা ছিল বিপুল ভিটামিনের উৎস। গড়ে দিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এসব চাষ করতে হতো না তেমন। অনাদর অবহেলায় বেড়ে উঠে দারুণ ভূমিকা পালন করতো।
বলতে গেলে, প্রদীপের জন্য কেরোসিন, রোগের জন্য কিছু ওষুধ ছাড়া যখন তখন বাজারমুখী না হলেও চলতো।

সমৃদ্ধ বর্তমানঃ
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। কোনো বাসস্থানকে তখনই ‘খাদ্য নিরাপদ’ বলা যায়, যখন এর বাসিন্দারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না। বাংলাদেশে এখন একটি লোকও পাওয়া যাবে না যে না খেয়ে রাত্রি যাপন করে। বাংলাদেশে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে।

বর্তমানে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার৷ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা৷ উদ্বৃত্ত কোন কোন খাদ্যপণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। আমদানি নির্ভরতা কমেছে গবাদিপশুসহ নানা শস্যের। কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন পদ্ধতির চাষাবাদের ফসল পাচ্ছে দেশ৷ মাছ-মুরগী ও গবাদিপশু চাষে বৈপ্লবিক সাফল্য এসেছে। তাই বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে এখন মানুষ খেয়ে-পরে বাঁচতে পারছে।

গত কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তার সমহারে বিপরীতমুখী প্রবণতায় কৃষি জমি কমে গেছে। এ ছাড়াও কৃষি উৎপাদনে ঋণাত্মক ভূমিকার প্রভাবকগুলো যেমন আবহাওয়া পরিবর্তন, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পোকামাকড়ের উপদ্রব ইত্যাদির কারণে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার সঙ্গে তালমিলিয়েও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াস অব্যাহত আছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। তখন মানুষ ছিল সাড়ে ৭ কোটি। দেশে এখন মানুষ প্রায় ১৭ কোটি। মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আবাদি জমি প্রায় ৩০ শতাংশ (স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) কমে যাওয়ার পরও খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিনগুণেরও বেশি। খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর গতিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তালিকায় এখন বাংলাদেশ। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এখন বাংলাদেশ অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। একই জমিতে দুই বা ততোধিকবার চাষ তো হচ্ছেই। ক্ষেত্র বিশেষে চারবারও কোনো কোনো জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষুধা সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতঃ করোনা সারাবিশ্বকে নতুন করে চেনাচ্ছে। সব দেশ আগে নিজে বাঁচতে সচেষ্ট। বন্ধ দরজা খুলছে না কেউ। এমন অবস্থায় নিজ নিজ সম্পদের ভান্ডার গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নাই। তাই খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিকল্প সব পদক্ষেপও আমলে নিতে হবে।

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। তাই মানুষের এ মৌলিক চাহিদা যেন নিশ্চিত হয় সেভাবে অগ্রসর হতে হবে। এজন্য ব্যক্তিগত/ পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দ্বিমুখী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

ব্যক্তিগত/পারিবারিক পর্যায়ঃ
সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি পরিবার। কাজেই পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হলে সভ্যতার ক্রমবিকাশও সহজ হয়। পুষ্টির অভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষকে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনতেও সুস্থ মানুষের প্রয়োজন। এখন দেখা যাক, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে কিভাবে ভূমিকা রাখা যায়।

১৷ আমাদের গ্রামীণ জনপদে এখনও পর্যন্ত একটি পরিবার যে পরিমাণ জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে তা ওই পরিবারের পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। এ রকম Family Farming ধারণাকে অনুসরণ করে বাড়ির আঙিনায় বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তি ও কলাকৌশল ব্যবহার করে শাকসবজি, ফল, ফুল, ঔষধি গাছ, মাছ চাষ ও সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি এবং গরু-ছাগল লালন পালন করা যায়।

২। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মধ্যম ও বড় সব ধরনের চাষির উৎপাদনে একটি সামাজিক বাজার ব্যবস্থা সেখানে গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ খরচ কম হবে এবং সবাই বাজারে পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন।

৩। হাইস্কুলে শেখা রচনার নাম ছিল ‘গ্রামে ফিরে যাও’। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হয়তো আবারো মানুষকে গ্রামমুখী করবে। যার থাকবে জমি তার জীবন বাঁচবে ততো ভালো করে। তাই যাদের জমি বা ভিটে আছে তারা এখনই কাজ শুরু করে দিলে এগিয়ে যাবেন। যাদের নেই তারা অন্যজনের অনাবাদী জমি লিজভিত্তিক চাষ করতে পারে।

৪। দেশে যদি পুরো পরিবার কোনো পণ্য উৎপাদনে জড়িত থাকে এবং পরিবারের সব সদস্যদের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ‘নিজেরা খাব এবং বাজারে বিক্রি করব’ এ ধারণায় পণ্য উৎপাদন করে তাহলে উৎপাদিত পণ্যের গুণমান অব্যশ্যই ভালো থাকবে। জাতি এক্ষেত্রে বিষাক্ত খাবার ভক্ষণের হাত থেকেও অনেকাংশে বেঁচে যেতে পারে।

৫। অনেক সময় দেখা যায় যে, বাপ দাদা বা তারও পূর্বপুরুষদের সময়ে লাগানো গাছপালা থেকে তেমন ভালো উৎপাদন হচ্ছে না। তবে এগুলো দীর্ঘদিন একই পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তা হয়ে থাকে রোগ প্রতিরোধী। এগুলোকে উৎপাদনমুখী করার জন্যও আছে প্রযুক্তি যা ‘টপ ওয়ার্কিং’ নামে পরিচিত। অনাবাদি ফলগাছগুলোকে সার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া দিয়ে উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

৬। কোন অনাবাদী জমি রাখা যাবে না। এমনকি বাড়ির আশেপাশে অব্যবহৃত ফাঁকা জায়গাটিও কাজে লাগানো দরকার। প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যায় এবং বাড়তি আয় রোজগারের মাধ্যমে উন্নত জীবন চর্চায় সে অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। মাটি ও বেড়ে ওঠার প্রকৃতিকে বিশ্লেষণপূর্বক স্থান ও সময়ানুযায়ী ডিজাইন করে শাকসবজি, ফল, ফুল, ঔষধি গাছ, মাছ চাষ ও সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি, কোয়েল পাখি, কবুতর এবং গরু-ছাগল, খরগোশ ও মৌমাছি লালন পালনসহ বাড়তি কর্মসংস্থানের জন্য কুটির শিল্প, মাশরুম চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা, সেলাই, মুড়ি, খৈ, চিড়া, দই ও আচার তৈরি ইত্যাদি কাজকর্মগুলো করা যেতে পারে। এভাবে গ্রাম বাংলার খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ ও সংস্কৃতি প্রবাহের মূল স্রোতধারা হতে পারে পারিবারিক কৃষি।

৭। বর্তমান সভ্যতা ইট-পাথরের। এখন সভ্যতার আচরণকে মাথায় রেখে ছাদ বাগানে শাকসবজিসহ ফলজ গাছ রোপণ করা যায় ব্যাপকহারে। এতে পরিবেশ বাঁচবে। জীবনও সবুজে হাসবে। পুষ্টির যোগানও হবে।

৮। কৃষিকে তুচ্ছ কাজ মনে করার মানসিকতা বাদ দিতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে কৃষি ও কৃষক দুটোই গুরুত্ব পায়। এখানেও একদা এমন ছিল। আবার সেই সোনালী সময় ফিরিয়ে আনতে হবে।

৯। যে যেই প্রফেশনেই থাকুক না কেন কৃষিতে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। এক সময় তাই করতেন অনেকে। এই রীতি ফিরিয়ে আনা যায় আবারো। আসলে কৃষিকাজ নানাভাবে দৈহিক এবং মানসিক পুষ্টি ও তৃপ্তির যোগান বাড়ায়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ঃ
১। অধিক উৎপাদন ও বিপণনকে উৎসাহিত করতে সরকার ইতিমধ্যেই কৃষি খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। আপামর কৃষক এইসব প্রণোদনা, প্যাকেজ নাও বুঝতে পারে, তাই তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকের হাতে এটি ওদের মতো করে নিয়ে যাওয়া যায়। এতে তারা নতুন উৎসাহে অধিক খাদ্য ফলাতে পারবে।

২। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে কয়েক হাজার চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেয়া হচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে। কৃষি বিভাগকেও শক্তিশালী করে আরো বেশি হারে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে এ ধরনের নিয়োগ দেয়া যায়।

৩৷ ব্যাপকহারে কৃষিকাজ শুরু হলে বীজ/চারা সংকট দেখা দিতে পারে। এজন্য বীজ/চারা সময়ে সময়ে স্বল্পমূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা যায়।

৪। মাঠ পর্যায়ে যে জিনিসের দাম ৫ টাকা, তা শহরের বাজারে এলে হয়ে যাচ্ছে ১০ গুণ বেশি ৫০ টাকা। এতে উৎপাদক কৃষক যেমন দাম পাচ্ছে না, তেমনি চড়া দাম গুনতে হচ্ছে বড় একটি ক্রেতা শ্রেণীকে। তাই একটি যুতসই সাপ্লাই চেইন সিস্টেম গড়ে তোলা যায়।

৫। কোন খাদ্য কখন কতটুকু লাগবে সেভাবে কর্মপরিকল্পনা করা যায়। যেমন-পেয়াঁজ, আদা, চিনির ঘাটতি নিয়ে সম্প্রতি তোলপাড় চলছে দেশে। অথচ এই তিনটি পণ্যই বাংলাদেশের মাটিতে বিপুলভাবে উৎপাদন উপযোগী। এ ধরনের পণ্যের বিষয়ে আগেভাগে পদক্ষেপ নিয়ে উৎপাদন করে ঘাটতি দূর করা যায়।

৬। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, খাবারের অভাবে দূর্ভিক্ষ হয় না, দূর্ভিক্ষ হয় সুষম বণ্টনের অভাবে। তাই খাদ্য সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া যায়।

৭। একবার শোনা গিয়েছিল, আফ্রিকার কিছু দেশে পড়ে থাকা বিপুল অনাবাদি জমি লিজ নিয়ে ফসল চাষ করে দেশে নিয়ে আসার কথা। সম্ভব হলে এবং লাভজনক হলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়।

৮। সরকারের তত্ত্বাবধানে সামাজিক বনায়নের একটি ধারা গড়ে উঠেছিল। যা সকলের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগায়। সুফলভোগীদের কাছে প্রশংসিতও হয়। শস্য উৎপাদনেও এই মডেল কাজে লাগানো যেতে পারে।

৯। প্যারিস শহরে ছাদবাগান করলে হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করা হয় মর্মে একটি সংবাদ শোনা যায়। মূলত সবুজায়নের মাধ্যমে পরিবেশ বাঁচাতে এই পদক্ষেপ। যা খুব ফল দেয়। এখানেও এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়। পুরোপুরি না হলেও ৫০ ভাগ হলেও মওকুফ করা যায়। এরপর কৃষি বিভাগ দ্বারা হোম সার্ভিস ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক ফল লাভ সম্ভব।

শেষ করার আগে একজন একজন সাহিত্যিক ও একজন কবির কথা বলি।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সন্তান সাহিত্যিক আসহাব উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, “আমাদের দেশে শেক্সপিয়ার-রবীন্দ্রনাথ চর্চ্চা দুই বছর বন্ধ রাখলে জাতির বড় ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার কৃষক এক বছর কাজ না করলে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।”

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখে গেছেন, “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত, পুষ্টির অগ্রসরতা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা সব চ্যালেন্জে পড়বে যদি সংকট দুয়ারে হানা দেয়। তবে আশার জায়গা হলো বিপুল জনশক্তি, কৃষির প্রতি নতুন আগ্রহ ও সর্বোপরি সহজে ফসল ফলানোর মতো এই দেশজুড়ে থাকা ভূমি। আর যাই হোক এমন সুজলা সুফলা ভূমিতে খাদ্য সংকট মানায় না। দূর্ভিক্ষ তো নয়ই। প্রয়োজন কেবল সুন্দর পরিকল্পনায় পা ফেলা। পরিবার থেকে সরকার- সব পর্যায়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা চলমান থাকলে হারবে না বাংলাদেশ।

লেখকঃ ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———