চট্টগ্রাম, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০ , ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পজেটিভ-নেগেটিভের দোলাচলেই রাঙামাটিতে মারা গেলো আইসোলেশনের রোগি!

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি থেকে প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল, ২০২০ ১০:৩৭ : পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া রোগিরা বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। প্রয়োজনীয় সার্পোট সরঞ্জাম বিহীন একটি জেনারেল হাসপাতাল যেন ডাল-তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দারের দায়িত্ব পালন করছে। করোনার প্রার্দূভাব নিয়ে গেলে শুধুমাত্র রক্তের নমুনা সংগ্রহ ছাড়া প্রয়োজনীয় কোনো চিকিৎসাই মিলছেনা রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে। এমনই চিত্র দেখা গেলো সোমবার।পজেটিভ আর নেগেটিভের দোলাচলেই চলেগেলো একটি প্রাণ। জেলা শহরে প্রথমবারের মতো ৫৫ বছর বয়সী অসুস্থ এক ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে থাকতে পারেন এমনটি আচঁ করতে পেরে উক্ত রোগিকে আইসুলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সর্দি কাশি ও গলা ব্যথা নিয়ে সংশ্লিষ্ট্য সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৫৫ বছর বয়সী ঐ ব্যক্তি রাঙামাটি শহরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা। গত শনিবার তিনি রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। এসময় তাকে ভর্তি করানো হয় সর্দি কাশির জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে। পরের দিন রোববার সকালে উক্ত রোগির শারিরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে এবং তার কন্ডিশন পর্যালোচনা করে চিকিৎসকগণ ধারনা করেন, উক্ত রোগি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।

এমতাবস্থতায় রোগিটিকে জেনারেল হাসপাতালের বিশেষায়িত আইসুলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয় বলে উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন। এসময় উক্ত রোগির শরীর থেকে দু’বার করে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানান, রোগির অবস্থা খারাপ দেখে তাকে আমরা চট্টগ্রাম রেফার্ড করে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এই ধরনের রোগির ক্ষেত্রে রেফার্ড করতে হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করতে হয়। যথারীতি যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের দুইটি হাসপাতাল থেকেই আপাতত পরীক্ষার রিপোর্ঠ না আসা পর্যন্ত এই রোগিকে চট্টগ্রাম নাপাঠাতে বলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রোববার দিবাগত রাত সোয়া দুইটার সময় রোগিটি মারা যায়। রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, উক্ত রোগিটি শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে মারা গেছে বলে আমরা ধারনা করছি। তিনি জানান, এখনো পর্যন্ত আমাদের পাঠানো রক্তের নমুনার রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট আসার পর তিনি করোনা রোগি কিনা সেটা জানা যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আমরা তার শারিরিক কন্ডিশনে করোনার লক্ষণ দেখায় তাকে আইসোলোশন ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়েছি। এদিকে সোমবার রাত এগারোটার সময় যোগাযোগ করলে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আরএমও জানিয়েছেন, এখনো আমাদের হাতে রিপোর্ট আসেনি। এরআগে মারা যাওয়া রোগিকে করোনা আক্রান্তের মতোই বিশেষ স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কবরস্থ করেছে প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানাগেলো, শুধুমাত্র অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালটিতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য কোনো উপকরণই নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক জানান, করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা দিতে হলে আইসিইউ ও পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর মেশিন থাকা প্রয়োজন। সেগুলোর কিছুই নেই। আবার এসব সামগ্রী এই হাসপাতালে যে দেওয়া হবে সে ধরনের কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। নামে মাত্র আইসোলেশন সেন্টারে সেবা চালু করে কোনো লাভ হবে না। এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। সোমবার হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য আমরা উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানাতে জানাতে বিরক্ত হয়ে গেছি। বেশি কিছু বললে আমাদের বা আমাদের ইমিডিয়েট স্যারদের ধমকায় উদ্বর্তন কর্মকর্তারা।

তিনি বলেন, সরকার আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষার পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিভাগের কর্তাব্যক্তিরা সেবার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বারবার চাউর করে বলে আসছেন। অথচ জেলা পর্যায়ে এখনো পর্যন্ত পরীক্ষা সিস্টেমটি চালু করেনি। এতে করে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আক্রান্তরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশ্ন হচ্ছে আইসোলশনে থাকা রোগিটির রিপোর্ট যদি পজেটিভ হয়, তাহলে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিট তাকে রিসিভ করবে। আর যদি নেগেটিভ রিপোর্ট আসে তাহলে উক্ত রোগিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ রিসিভ করবে। তাহলে তার সময়োপযোগি চিকিৎসা নিশ্চিতে যেকোন একটিতে স্থানান্তর করা যেত। শুধুমাত্র পরীক্ষার কারন দেখিয়ে চট্টগ্রামের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো সম্ভাব্য করোনা আক্রান্ত রোগিকে রাঙামাটি থেকে রেফার্ড করার অনুমতি প্রদান করেনি। যেহেতু সংশ্লিষ্ট্য হাসপাতালগুলো এই রোগিকে রিসিভ করবে না এমনটি নিশ্চিত হওয়ার পরে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিধারূন শ্বাস কষ্টে থাকা উক্ত রোগিকে চট্টগ্রাম রেফার্ড করেনি। পরবর্তী সময়ে যা হওয়ার তা-ই হলো। রাত সোয়া দুইটার দিকে সেই রোগিটি মারা গেলেন। পরীক্ষার রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে যদি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকে; তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, তাহলে প্রাথমিক উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এই রোগি কি ধুকে ধুকেই মারা যাবে। সাত লক্ষ জনসংখ্যার এই রাঙামাটি জেলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে আরেকটি ইউনিট স্থাপন কেন করা হয়নি? সামান্য ভেন্ডিলেটর ব্যবস্থাও করা হয়নি এতোদিনে? তারপরও যদি অন্তত রাঙামাটিতে করোনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকতো বা চট্টগ্রাম থেকে কয়েক ঘন্টায় রিপোর্ট হাতে পাওয়া যেত? তাহলে হয়তো এই একটি প্রাণও হারাতে হতোনা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ছাড়াই শুধু-মাত্র পজেটিভ-নেগেটিভের দোলাচলেই মারা গেলো রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা ৫৫ বছর বয়সী রোগিটি। নির্মম এই মৃত্যুর দ্বায় কে নেবে??

Print Friendly and PDF

———