চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০ , ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সময়মতো টিকা না দেওয়ায় সাজেকে ছড়াচ্ছে হাম, ৩৫ দিনে ৯ শিশুর মৃত্যু

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি থেকে প্রকাশ: ১ এপ্রিল, ২০২০ ৪:৪৬ : অপরাহ্ণ

নির্দিষ্ট্য সময়ে টিকা না দেওয়ায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ির উপজেলাধীন দূর্গম সাজেক ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে হাম রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত এক মাসে সাজেকে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯ জন শিশু নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন।

সর্বশেষ মঙ্গলবার মারাগেছে নিকেতন চাকমা (১৫)। সে সাজেকের বেটলিং এলাকার বাসিন্দা সুরেশ চাকমার সন্তান। সাজেক ইউপি সদস্য গরেন্দ্র ত্রিপুরা ৩১মার্চ মঙ্গলবার রাত ৯টায় মুঠোফোনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান,এনিয়ে গত একমাসের ব্যবধানে সাজেকে ৯ শিশু মারা গেলো। সোমবার হতে মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই সব এলাকায় নতুন করে হাম রোগে দেখা দিয়ে ১৫০জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএসও ডাঃ ইফতেখার আহম্মেদের সাথে বহু চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

এদিকে, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, সাজেকবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে ইতোমধ্যেই সেখানে সেনাবাহিনী-বিজিবি ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৫টি টিম প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে।

জেলা প্রশাসক জানান, বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সাজেকে পুষ্টিগুন সম্মৃদ্ধ খাদ্য বিতরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে এবং সেগুলো বিতরণও করেছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও উক্ত এলাকায় সম্প্রতি ইপিআইয়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিমও সাজেকে সরেজমিনে বিষয়টি পর্যবেক্ষণে গিয়েছে এবং পুরো সাজেক ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ব্যাপক আকারে কর্মসূচী হাতে নিয়েছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ।

এরআগে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি পরিমানে ছড়িয়ে যাওয়ায় এবং শিশু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় গত ২৫ মার্চ চট্টগ্রামস্থ জিওসি কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম হেলিকপ্টারে করে সাজেকে যায় এবং সেখান থেকে হামে আক্রান্ত ৫শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে সেরে তোলে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ১৭০ নং তুইছুই মৌজাস্থ ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার জৌপৈই থাং ত্রিপুরা জানিয়েছেন, সাজেকের অরুন পাড়া, লাংকাটান পাড়া ও হাইচ্যাপাড়া নামক এই তিনটি এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় গত ফেব্রুয়ারিতে।

বাঘাইছড়ি উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম এই ইউনিয়নের অরুনপাড়া, লংথিয়ান ত্রিপুরা পাড়া এবং হাইসাপাড়াসহ কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে রোগটি ছড়ায় মহামারী আকারে।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ১৪দিনে হামরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুরা হলো সাগরিকা ত্রিপুরা (১১), সুজন কুমার (৯) কহেন ত্রিপুরা (১০), বিধান ত্রিপুরা (১২) রেজিনা ত্রিপুরা (২), নিক্সন ত্রিপুরা (৩)। রপর ২২মার্চ প্রাণ হারায় গোরাতি ত্রিপুরা(৯), ২৩মার্চ বিকেলে সাগরিকা ত্রিপুরা(১৩), ২৪মার্চ দিবাগত গভীর রাতে মারা যায় আরও এক শিশু। সর্বশেষ মঙ্গলবার বেটলিংয়ে ৩১শে মার্চ রাতে মারা গেছে নিকেতন চাকমা (১৫)।

এনিয়ে ৩৫ দিনে মারা গেছে ৯ জন। স্থানীয় হেডম্যান জানান, গত কয়েক দিন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও হঠাৎ করে রোববার থেকে পরিস্থিতির আবারও অবনতি হতে থাকে। এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১৫০ শিশু হামরোগে আক্রান্ত হয়ে আছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা বলেন, সাজেক ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী তিনটি গ্রামে এই রোগ দেখা দিলেও এখন নতুন করে আরো কয়েক গ্রামে হাম রোগ দেখা দিয়েছে। এসব শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলার কারনেই সাজেকে এই হাম রোগের বিস্তার ঘটছে।

এলাকাবাসীর সাথে আলাপ করে জানাগেছে, উপজেলার সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে হামের টিকা না দেওয়ার কারনেই এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্রব ঘটেছে।

তবে জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ বিপাশ খীসা জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষজন বিভিন্ন কুসংস্কারে বিশ্বাসী এবং টিকা দিতে অনীহা থাকায় শিশুদের হামের টিকা দিতে চায়নি।

এদিকে, শিশুমৃত্যুর সঠিক ‘কারণ’ ও ‘টিকাদান বিভাগে’র কোনো গাফিলতি আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব জিতুকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এই কমিটির মাধ্যমে প্রাপ্ত রিপোর্ট পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ।

Print Friendly and PDF

———