চট্টগ্রাম, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২০ , ২৮শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এক জায়গায় এক রাতে নীরব হয়ে গেল ১৫টি প্রাণ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ!

মোঃ নাজিম উদ্দিন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি প্রকাশ: ২৩ মার্চ, ২০২০ ১০:৫৩ : পূর্বাহ্ণ

সড়কে থামছে দুর্ঘটনা। আঁকা-বাঁকা সড়ক, অদক্ষ চালক, বিনা প্রয়োজনে ওভারটেক, ট্রাফিক আইন না মানা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র গাড়ি থামানোসহ বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও রোধ করা যাচ্ছে না। মহাসড়কের শাহ আমানত
সেতু এলাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৫৫ কিলোমিটারে একশরও বেশি ঝঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এরমধ্যে শাহ আমানত সেতু থেকে দোহাজারীর ৪৫ কিলোমিটারে রয়েছে অর্ধশত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। আঁকা-বাঁকা হওয়ার কারণে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে।

এছাড়া এই একশ ৫৫ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে যাত্রীদের সময় লাগছে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা। গত এক বছরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে কয়েক সড়ক দুর্ঘটনায় দেড় শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছে। এসব হতাহতের বিষয়ে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

হতাহতের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকার কারণ কি জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, সড়ক দুর্ঘটনার সব ঘটনায় মামলা হয় না। অধিকাংশ ছোটখাটো ঘটনায় দুপক্ষের মধ্যে আপোষ হওয়ার কারণে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকেনা।

মহাসড়কটি যেন লাশের মিছিলে রূপ নিয়েছে। এক রাতেই নীরব হয়ে গেল ১৫টি তাজা প্রাণ। এই নীরবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে নীরব জসিমসহ দুই ভাই। ওইদিন রাতে জামাতে এশার নামাজ পড়ে আমিরাবাদের বটতলীতে ঐতিহ্য নামে কম্পিউটার ট্রেনিং
সেন্টার বন্ধ করে সাংবাদিক কায়সার হামিদের ভাই নীরব জসিম তাঁর ছোট ভাই তাওরাত বেলালকে নিয়ে লেগুনাতে উঠে আজিজনগরে বাড়িতে যাচ্ছিলেন।

বাড়িতে পৌঁছার এক কিলোমিটার আগে জাঙ্গালিয়া এলাকায় নীরব জসিম ও তাওরাত সড়কে একে বারেই নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাড়িতে গেল নীরব জসিমসহ দুই ভাইয়ের নিতর দেহ। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ভাইকে এক সাথে হারিয়ে শোক সাগরে ভাসছেন কায়সার হামিদের পরিবারটি।

শনিবার রাতে এক নিমিষেই সেখানে লাশের মিছিলে রূপ নিয়েছে। এভাবে এই মহাসড়কে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেকের তাজাপ্রাণ।

পঙ্গু হয়ে সারাজীবন যন্ত্রণায় ভোগছে হাজারো মানুষ। সড়ক যেন নৈরাজ্যে পরিণত হয়েছে। নৈরাজ্যের এই পরিণতি ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। এসবের দায় কে নেবে? কে থামাবে লাশের মিছিল? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের মাঝে।

গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতী জাঙ্গালিয়া এলাকায় লবণবাহী ট্রাকের সাথে যাত্রীবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছে। সড়কে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ওই এলাকাটিও নীরব হয়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে ছিল। গত বছরের ২৭ শে মার্চ রাতে জাঙ্গালিয়ায় একই স্থানে বাসের সাথে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ আটজন নিহত হয়েছে।

ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারিপটিয়ার ভাইয়ার দীঘিরপাড় এলাকায় বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন মারা যায়। আহত হয় ১১ জন। এই বছরের ২৪ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে মহাসড়কের পটিয়ার শান্তিহাটে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক দম্পতিসহ তিনজন নিহত হয়।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। গত এক সপ্তাহ আগে হারবাং এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় ওসমান ও শামসুল নামের দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছে।এই সড়কে থামছে না দুর্ঘটনা। ড্রাইভিং লাইসেন্সহীন চালক এক শ্রেণির কিশোর ও তরুণের মাত্রাহীন আসক্তি আর অধিক গতিই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এমনটাই দাবি নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা লোকজনের। নিরাপদ সড়ক চাই লোহাগাড়া উপজেলার আহবায়ক মোজাহিদ হোছাইন সাগর বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বিশেষ করে লোহাগাড়া উপজেলা অংশে ঝুুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক, লাইসেন্সহীন ড্রাইভার ও চালকদের অদক্ষতা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

এছাড়াও এই মহাসড়কটি এখনো চার লেইনে উন্নীত না হওয়া, নিষিদ্ধ থ্রি হুয়লার যানবাহন যেমন ব্যাটারি চালিত রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, ট্রলি ও ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলাচলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত লেগেই আছে। এই মহাসড়কে
সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জন্য দ্রুত মহাসড়কটি চার লাইনে উন্নীতকরণ করা দরকার  ও লাইসেন্স বিহীন চালক ও অবৈধ যানবাহন চলাচল রোধের জন্য আরো নজরদারিবৃদ্ধি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার।

দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইয়াসির আরাফাত বলেন,মহাসড়কটির অধিকাংশ স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। ব্যস্ত সড়কে পরিণত হওয়া ও সড়ক সরু হওয়ায় উপচে পড়ছে
যানবাহন। এতে দুর্ঘটনা হচ্ছে। এছাড়া লবণের পানি সড়কে পড়ে পিচ্ছিল হওয়ায়হঠাৎ দুর্ঘটনা বেড়েছে।  সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

Print Friendly and PDF

———